অতিথি সন্তান

অতিথি সন্তান

আজ আমি আমার সেলুনে  বহুবার দেখা এক ছেলের চুল কাটার সময় বহুদিনের প্রতীক্ষিত প্রশ্নটা করে বসলাম,
— খেয়াল করেছি, তুমি প্রতিবার চুল অনেক বড় হওয়ার পর সেলুনে আসো। তোমার স্কুলের স্যার-ম্যাডামরা কি তোমাকে চুলের জন্য বকাবকি করে না?!

ছেলেটা বেশ উদাস মনে মাথা নাড়িয়ে হ্যা জানালো। আমি ওর উদাস ভঙ্গি দেখে কিছুটা অবাক হলাম। আবার বললাম,
–তাহলে কেন প্রতিবার চুল এতো বড় হওয়ার পর সেলুনে আসো।

–(বিষন্ন গলায়) বাবা চুল কাটার জন্য টাকা দেয় না।

আমি ওর জবাব শুনে হতভম্ব হয়ে গেলাম। ওকে এখন বলার মতো কোনো কথা খুজে পাচ্ছি না। সেদিন ওর সাথে আর কোনো কথা বলতে পারলাম না। কিন্তু ও চলে যাওয়ার পরেও ওর প্রতি এক বিষন্ন কৌতুহল জমা হয়ে থাকে আমার মনে। ছেলেটা স্কুল পড়ুয়া। প্রায়ই দেখি আমার দোকানের সামনে দিয়ে হেটে স্কুলে যায়। যে স্কুলের ইউনিফর্ম পড়ে যায় সেটা আমাদের এই অঞ্চলের খুবই নামকরা ভালোমানের সরকারি স্কুল। সেখানে ভর্তি হতেও প্রচুর মেধা লাগে। আমি ভাবি, “ ওর মতো মেধাবী ছাত্রের বাবা কেন চুল কাটার জন্য ওকে টাকা দেবে না। ওরা কি খুবই গরীব!?  এতটাই কি গরীব যে মাসে একবার চুল কাটার টাকাও সহসা জোগার করতে পারে না!! কিন্তু এই এলাকার অনেক ভিক্ষুকও তো প্রতি মাসে আমার দোকানে এসে চুল কাটিয়ে যায়। ওর বাবা আর যাই হোক, অন্তত ভিক্ষুকের চেয়ে বেশী গরীব হবে না। তাহলে কেন সে তার মেধাবী ছেলের চুল কাটার জন্য সময়মত টাকা দিবে  না!? ”

হঠাৎ মনে হলো, “আমি এসব কি ভাবছি!! ওর বাবা কেনো ওকে সময়মতো টাকা দেয় না তা ভেবে আমি কেন দুশ্চিন্তা করছি!!”

তবে সিদ্ধান্ত নিলাম, ছেলেটাকে পরের বার সেলুনে দেখলে ওকে অবশ্যই জিজ্ঞেস করবো তোমার বাবা কি করেন। যদিও অপরিচিত  কাউকে প্রশ্নটা করা ভদ্রতার পরিচয় না, কিন্তু তবুও…. কৌতুহলবশত মানুষ কত কিই না করে।

প্রায় দু’মাস পর ছেলেটাকে আবার দেখলাম আমার সেলুনে। ওর চুলগুলো কান বেয়ে কানের লতি অব্দি নেমে গেছে। ভদ্র চেহারার ছেলেটাকে মাথাভর্তি এতো বড় বড় চুলে খুবই বেমানান দেখাচ্ছে। এবার ওর চুল কাটার সময় সাহস করে ওকে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম,
–তোমার বাবা কি করেন?

ও কিছুক্ষন গম্ভীর মুখে চুপ থাকার পর বললো,
–উনি বাস ড্রাইভার।

ভাবলাম, যদি ওর বাবা বাস ড্রাইভার হয়ে থাকে তাহলে তো ওরা তেমন গরীবের পর্যায়ে পড়ে না। কারন, আমি জানি বাস ড্রাইভারদের ইনকাম বেশ ভালোই হয়। তাহলে কেন ওর বাবা ছেলের চুল কাটার টাকা দেয়ার ব্যাপারে এতো কপটতা করে!?

আমি বললাম,
–তাহলে ঠিক কি কারনে তোমার বাবা সময়মতো চুল কাটার টাকা দেয় না সেই কারনটা কি জানতে পারি?

ওর গম্ভীর মুখ আরো গম্ভীর হয়ে গেলো। চোখে ভীষন বিষন্নতার ছাপ। কিছুক্ষন চুপ থাকার পর বললো,
–কারন জানার আপনি কে!

কথাটা বলার পরপরই ওর চোখ বেয়ে টপটপ করে কয়েকফোটা অশ্রু ঝরে গেলো। ও একহাতে চোখের জল মুছে চেয়ার থেকে উঠে দৌড়ে চলে গেলো। ওর চুল এখনো ঠিকমতো কাটা হয়নি।চুল কাটার মাঝপথেই ওকে  চলে যেতে দেখে হতবাক হয়ে গেলাম। তার চেয়েও বেশি হতবাক হলাম ওর চোখের অশ্রু দেখে। অবাক হয়ে ভাবলাম, কারন জিজ্ঞেস করাতে ওর এভাবে কান্নায় ভেঙে পড়ার কারন কি হতে পারে!!

পরের দিন দুপুর বেলা ওকে সেলুনের সামনে দিয়ে হেটে যেতে দেখলাম। ও স্কুল থেকে ফিরছিলো। মাথায় একটা বড় উলের টুপি । ওকে দেখে কৌতুহলের পীড়ায় চুলকাটার কাজ মাঝপথে ফেলে রেখেই ওর পিছু নিলাম। ঠিক কি কারনে সেলুনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ ফেলে রেখে ওর পিছু নিচ্ছি তা নিজেই এইমুহূর্তে আন্দাজ করতে পারছি না। দেখলাম ও একটা ওয়াল-টিনসেট বাসায় ঢুকলো। আমি বাসাটার দরজার সামনে দাড়ালাম। ওদের বাসা থেকে কেমন যেন উদ্ভট পচা গন্ধ নাকে লাগছিলো আমার। চোখে পড়লো দুইটা কাচের বোতল। নাটক-সিনেমায় দেখতাম মদের বোতলগুলো এরকম দেখতে। ভাবলাম, ওর বাবা মদটদ খায় নাকি!!

ও স্কুল ড্রেস বদলে যখন বারান্দা দিয়ে হেটে যাচ্ছিলো তখন ওর মাথার দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠলাম। দেখি,  ওর মাথা টাক এবং মাথায় অসংখ্য কাটা দাগ। কাটা দাগে পুরো মাথা ক্ষত-বিক্ষত।  দাগগুলো এখনো শুকায় নি তাই বোঝা যাচ্ছে এসব ক্ষত বেশিদিন আগের না। আমাকে বারান্দার সামনে দেখে ছেলেটা হকচকিয়ে গেল। বললো,
–আপনি এখানে কি করছেন!!

আমি কি জবাব দিবো ভেবে থতমত খেয়ে গেলাম। প্রসংগ এড়িয়ে বললাম,
–তোমার মাথায় এতো কাটাদাগ কেন? দেখে তো মনে হচ্ছে কেউ তোমার চুল ব্লেড দিয়ে খুবই বিশ্রিভাবে কেটেছে। দাগগুলোতো মনে হচ্ছে ব্লেডের কাটা দাগ। ইশ! … তোমার পুরো মাথাই দেখছি ভয়াবহ কাটাদাগে ভর্তি। কিভাবে হলো এসব!?

ও মুখে বিষন্নতা এনে মাথা নিচু করলো। দেখি ওর চোখ বেয়ে অশ্রু গড়াচ্ছে। আমি বললাম,
–এভাবে কাদছো কেন? কালকে সেলুন থেকেও তুমি চোখ মুছতে মুছতে চলে গেলে… এই যে আমার দিকে তাকাও… তুমি নিশ্চয়ই বড় কোনো সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছো। আমাকে প্লিজ বলো সমস্যাটা কি? আমি তোমার কোনো খারাপ চাই না। মুরুব্বি হিসেবে যেহেতু প্রশ্নটা করেছি, তুমি কি তবুও জবাব দেবে না!

ও চোখ মুছতে মুছতে বললো,
–আমার বাবা সেভিং ব্লেড দিয়ে এভাবে আমার চুল কেটেছে।

–বলো কি!! তোমার বাবা কেন চুল কাটতে গিয়ে তোমার মাথা এতো বিশ্রিভাবে ক্ষত-বিক্ষত করবেন!! আর তুমিই বা কি করছিলে তখন!?

–আমার বাবা বাসায় আসলে সবসময় মদের নেশায় মাতাল থাকে। কারনে-অকারনে আমাকে খুব মারে। কাল চুল অর্ধেক কেটে বাসায় এসে পড়েছি দেখে বাবা  মাতাল অবস্থায়ই রাগে গজগজ করতে করতে আমার চুল কাটে। আমি ব্যাথায় চিৎকার করে সরে যেতে চাইলেই বাবা আমার হাটুতে জোরে লাথি দেয়।

কথা শেষ করতে করতেই ছেলেটা কান্নায় ভেঙে পড়ে। আমার পায়ের নিচ থেকে যেন মাটি সরে গেলো ওর কথা শুনে। একজন বাবা এতো নিষ্ঠুর কিভাবে হয়!!

ভিতরের রুম থেকে কেউ ভাঙা কন্ঠে বলে উঠলো,
–রবিন… কার সাথে মিনমিনিয়ে কথা বলছিস? বাইরে কে?

পুরুষ কন্ঠ শুনে বুঝলাম, ঐ হতচ্ছরা লোকটাই হয়তো ছেলেটার বাবা।

———-

রবিনের বাসার সামনে এখন বেশ কয়েকজন জনমানব জড়সড় হয়েছে। যেটার কারন হল আমার আর রবিনের বাবার মধ্যে তুমুল বাকবিতন্ডা। একপর্যায়ে হাতাহাতির পর্যায়েও চলে যায় বিষয়টা। লোকটা পুরো দমে মাতাল।কথাবার্তায় আর আচরনে বোঝা যায় উনি পৃথিবীর নিকৃষ্টতম বাবাদের তালিকায় অন্যতম। লোকজন হাতাহাতি ঠেকানোর পর আমি ফিরে আসলাম সেখান থেকে। রবিনের প্রতি তীব্র মায়ায় চোখ ছলছল করছে এখন। সেই সাথে কানে ভাসছে ওর বাবার বলা কথা, “আমার ছেলেকে আমি যেভাবে খুশি সেভাবে পালবো,  তাতে তোর কি!! ও কি তোর খায় না পড়ে!  তুই আমাকে বাচ্চা লালন-পালন শেখানোর কে!?”

মুহুর্তেই গাঁ রাগে জ্বলে গেলো। লোকজনের সাথে কথা বলে জানলাম,  রবিনের মা বেচেঁ নেই। অসুখের সময় বিনা চিকিৎসায় মারা গিয়েছিলেন তিনি। ভাবলাম, নিশ্চয়ই এটার পিছনেও কারন ছিল ঐ বদ লোকটার মদের নেশায় টাকা উড়ানো আর পরিবারের প্রতি অবহেলা।

সারাদিন কাজে মন দিতে পারলাম না। রাতেও ঘুম হলো না। সবসময় চোখের সামনে ভাসে রবিনের মাথার অসংখ্য ক্ষত-বিক্ষত কাটা দাগ। যতই চাই বিষয়টাকে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে,  ততই যেন সে বিষয়ে ভাবনা আরো তীব্র হয়। এভাবে কেটে গেলো বেশ ক’টি দিন। রবিনকে প্রতিদিন দেখি মাথায় উলের টুপি পড়ে সেলুনের সামনে দিয়ে খুবই বিষন্ন মুখে হেটে যেতে। ওকে দেখামাত্রই আমার বুক চুপসে যায়। এতো কোমলমতী মেধাবী ছেলেটার এই দুরাবস্তা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না।

অনেক বিষয় ভেবেচিন্তে একদিন সকালবেলা রবিনের বাসায় আবার গেলাম। আমাকে আবার দেখে রবিনের বাবা হকচকিত। সে গন্ডগোল বাধানোর আগেই আমি নরম সুরে বললাম,
–আমি আপনার ছেলেকে আমার ছেলের লোজিং টিচার হিসেবে আমার বাসায় নিয়ে যেতে চাই। ও আমার বাসায় থাকবে,  খাবে,  লেখাপড়া করবে আর আমার ছেলেকে পড়াবে। ওর ভরনপোষনের সব খরচাপাতি আমার। এতে আপনার ঘাড় থেকে দায়িত্বের ভার সরে যাবে এবং ছেলেটাকেও আর কোনো কষ্ট সহ্য করতে হবে না।

সে আমার কথায় চটে গেল। শুরু করলো তুমুল হৈ চৈ। আবারো চারদিক থেকে মানুষ জড় হওয়া শুরু হল। ঝগড়া হুট করে শুরু হলেও ক্রমশ তা নিয়ন্ত্রনে এলো। লোকজন আমার প্রস্তাবটাকে বেশ যুক্তিযুক্ত মনে করলো। তারাও জানে রবিনের বাবা কি টাইপের লোক। তারা তাকে  অনেকভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলো যে , রবিনকে আমার হাতে তুলে দিলেই তার ভালো হবে। এতে তারও ছেলের জন্য কোনো ভোগান্তি পোহাতে হবে না, আর ছেলেটাও অত্যাচার থেকে রেহাই পাবে। অনেক তর্ক-বিতর্কের পর ঐ মাতাল লোকটা শেষমেষ রাজি হলো রবিনকে লোজিং টিচার হিসেবে আমার হাতে তুলে দিতে।

———–

রবিন আমাদের বাসায় থেকে দিব্যি ভালোভাবেই দিনকাল কাটাচ্ছে।ও  ক্লাস সেভেনের খুবই মেধাবি ছাত্র। নিজে পড়াশোনা করার পাশাপাশি আমার ক্লাস ফাইভে পড়া ফাকিবাজ ছেলে জাহিদের পড়াশোনায়ও খুব সাহায্য করে। কিন্তু সমস্যা হলো জাহিদ ইদানিং ওকে একদমই সহ্য করতে পারে না। জাহিদ প্রায়ই আমাকে গম্ভীরভাবে বল,  “বাবা, তুমি দেখছি সারাক্ষনই রবিনের প্রশংসা করো। অথচ আমাকে সারাক্ষনই বকা দাও। কেন? আমার থেকে ও-ই কি তোমার কাছে বেশি প্রিয়।”

আমি জাহিদ নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করি যে , “আমি তোমাকে বকা দেই তোমার ভালোর জন্যই।  যাতে তুমিও রবিনের মতো ভদ্র এবং ভালো ছাত্র হও। ”

কিন্তু ও আমার কোনো কথা কানে না নিয়ে উলটো রাগ দেখায় আমার সাথে। রবিনের সাথেও দেখছি ও ইদানিং খুব খারাপ ব্যবহার করে। আমি যখন ওকে এর জন্য বকি,  তখন ও আরো রেগে যায়।

একয়দিন রবিন আর জাহিদ একসাথেই ঘুমাতো। কিন্তু আজ জাহিদ কড়া ভাবে বললো যে ও আর রবিনের সাথে ঘুমাবে না। ওকে কোনোভাবেই  মানাতে পারলাম না। তাই বাধ্য হয়ে ছোট একটা খাট কিনে ডাইনিং রুমে রবিনের ঘুমানোর ব্যবস্থা করলাম।

এদিকে আমার স্ত্রীও রবিনকে বেশি একটা ভালো চোখে দেখে না। সে শুরু থেকেই রবিনকে বাসায় আনার ব্যাপারে বেশ নারাজ। প্রায়ই দেখি সে রবিনকে অযথা বকাবকি করার সুযোগ খোজে। তবে রবিন সবকিছু বেশ সহজভাবেই মানিয়ে নেয়। আমি মাঝেমাঝে ওকে দেখে অবাক হয়ে ভাবি, এতটুকু ছেলে মানসিকভাবে এতো ম্যাচিউর কিভাবে হয়!!

দিন যত এগোতে থাকে রবিনের প্রতি জাহিদের রাগ এবং আমার স্ত্রীর বিরক্তি ততই বাড়তে থাকে। এদিকে রবিন জাহিদকে যতই পড়ালেখায় সাহায্য করতে চায়, জাহিদ ততই ক্ষিপ্ত হয়। জাহিদের রেজাল্টেরও কোনো উন্নতি নেই। রেজাল্ট নিয়ে যখনই ওকে বকাঝকা করি,ও তখন আরো রেগে যায়। আমাকে বলে যে, আমি নাকি ওর চেয়ে রবিনকেই বেশি ভালোবাসি। আমি ওর ভুল ভাঙানোর চেষ্টা করলে ও বলে, “আমাকে যদি সত্যিই ভালোবাসো তাহলে রবিনকে এখনই ওদের বাসায় ফিরিয়ে দিয়ে আসো।” ওর এই কথা শুনলেই আমার মাথায় রক্ত উঠে যায়। মনে পড়ে যায় রবিনের বাবার নৃশংসতার কথা। জাহিদকে তখন কড়াভাবে বারণ করে বলি, “রবিনের বাবা ভালো লোক না হওয়ার কারনেই রবিনকে আমাদের বাসায় এনেছি তোর লোজিং টিচার হিসেবে। আর তুই কিনা এরকম উলটাপালটা কথা বলছিস!! আল্লাদ পেয়ে একদম মাথায় উঠে গেছিস তাই না!”

জাহিদ এতে আরো ক্ষুদ্ধ হয় এবং রাগে ফোসফোস করতে থাকে। আমি যতই চেষ্টা করি রবিনের সাথে ওকে মিলিয়ে দিতে, ও ততই যেন হিংস্রভাবে ছিটকে যায়।ওর আচরনের কারনে আমাকে ইদানিং খুব দুশ্চিন্তার মধ্যে কাটাতে হয় সারাদিন।

রবিন ক্রমে ক্রমে জে।এস।সি, ম্যাট্রিক ও ইন্টারের রেজাল্টে বরাবরই খুবই মেধাবী ছাত্রের পরিচয় দিয়েছে। মাঝে মাঝে ও ওর বাবার সাথে দেখা করতে যায়। কিন্তু প্রতিবারই ওর বাবার নিরস আচরন দেখে হতাশ হয়ে যায়। অন্যদিকে জাহিদের রেজাল্টে আমি খুবই হতাশ। ওর কোনো উন্নতি লক্ষ্য করছি না। উলটো যেটার উন্নতি হয়েছে সেটা হলো রবিনের প্রতি প্রচন্ড হিংসা ও ক্রোধ। রবিন জাহিদকে লেখাপড়ার দিক দিয়ে যথেষ্ট সাহায্যের হাত বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু জাহিদ সবসময়ই ওকে শত্রুর দৃষ্টিতেই দেখে গেছে। আমি বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছি যে, রবিনের মাধ্যমে জাহিদের পড়ালেখার কোনো উন্নতি হবে না। অন্যদিকে আমার স্ত্রীর একটাই কথা, “রবিনকে ওর বাবার কাছে দিয়ে এসো। এমনিতেই অভাব-অনটনের সংসার, তার উপর আবার অযথা নতুন মুখ জুটেছে। ওর জন্য জাহিদের লেখাপড়ায় কোনদিকে উন্নতি হয়েছে হ্যা?! শুধু শুধু কেন ওর পিছনে পয়সা ঢালছো!”

রবিনের লেখাপড়ার খরচ জাহিদের তুলনায় অনেক কম। ধরতে গেলে দশ ভাগের একভাগেরও কম। জাহিদকে ভালো একটা বেসরকারি স্কুলে পড়াই এবং অনেক ভালো ভালো স্যারের কাছে প্রাইভেটও পড়াই। তাতেও ওর কোনো গতি দেখছি না। অথচ রবিন কোনো প্রাইভেট ছাড়াই নামকরা সরকারী স্কুলে পড়ে বারবার দুর্দান্ত মেধার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে। রবিনের কারনে জাহিদের লেখাপড়ায় কোনো উন্নতি না হলেও রবিনকে ওর বাবার কাছে ফিরিয়ে দেয়ার ব্যাপারে কোনোদিন ভাবিনি। ভাবার সাহসও করিনি। ঐ নির্মম স্বভাবের মাতাল লোকের কাছে রবিনের মতো কোমলমনা ছেলেকে ফিরিয়ে দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। এতদিন ধরে রবিন আমাদের সাথে থাকায় ও যেন আমার কাছে পরিবারের অংশ হয়ে গিয়েছে। ওর প্রতি আমার এতোটা মায়া জমে গেছে যা বলে প্রকাশ করা সম্ভব না। ওর মতো ভদ্র ও কোমলমনা ছেলে আমি দ্বিতীয়টা দেখিনি। একদিন ও আমাকে ক্ষীনস্বরে বলেছিলো,
–আপনাকে বাবা বলে ডাকতে পারি? আমার খুব ইচ্ছে হয় আপনাকে বাবা ডাকতে। আপনি এতদিন ধরে একজন বাবার মতই আমার লালন-পালন করে যাচ্ছেন। এতো খেয়াল রাখছেন যে আমার মনে হয় যেন আমি এই পরিবারেরই কেউ।

মনের অজান্তেই আমার চোখ ভিজে গিয়েছিলো সেদিন ওর কথাটা শুনে।

 

বহুবছর পেরিয়ে গেছে…

সেই কোমলমনা ছোট ছেলে রবিন এখন আর ছোট ছেলে নেই। ও এখন একজন দায়িত্ববান যুবক। এতটাই দায়িত্ববান যা ভাবলেও অন্তর বিষ্ময়ে পূর্ণ হয়ে যায়। ও এখন এক নামকরা হাসপাতালের বড় ডাক্তার। ওর বাবা বেশ কয়েক বছর হলো লিভার ড্যামেজে মারা গেছেন। কিন্তু ও এর জন্য নিজেকে কখনও এতিম মনে করেনি। ও আমার করা সামান্য যত্ন ও আদরে মোহিত হয়ে এতদিন ধরে আমাকে সম্বোধন করে এসেছে “বাবা” হিসেবে। কিন্তু আফসোস, আমার বহুচেষ্টার পরেও আমার রক্তের আপন ছেলে জাহিদের কোনো গতি হলো। ওকে বহুবার বললাম, “তোর রেজাল্ট খারাপ হয়েছে তো কি হয়েছে, তোর জন্য অনেক কষ্টে অমুক চাকরির ব্যবস্থা করেছি। তুই ওটাতে ঢুকে যা। ভালো চাকরি হাতে নেই বলে কি তুই আজীবন বেকার থাকবি!?” কিন্তু ও চাকরি পছন্দ হয় না বলে আমার কথা নাকোচ করে দেয়।  শুধু তাই না, ওর গতি হলো উলটো দিকে। আমাকে না জানিয়ে ও বিয়ে করে ঘরে আনে এক নিতান্তই অভদ্র মেয়েকে। একদিন আমি বললাম, “এই মেয়েকে আমি আর ঘরে জায়গা দিবো না। যে মেয়ে কিনা অকারনে নিজের শ্বশুর-শ্বাশুরীর সাথে বেয়াদবি করে বিশ্রী গালি দিতে পারে, সেই মেয়ের কোনো অধিকার নেই এই বাড়িতে থাকার।”

জাহিদ আমার কথায় উলটো আমাকেই রাগ দেখিয়ে ওর স্ত্রীকে নিয়ে বাসা ছেড়ে চলে যায়। এরপর থেকে যতই আমি ওর রাগ ভাঙানোর চেষ্টা করি, ও ততই আমার প্রতি হিংস্র আচরন করে। কয়েকদিন পরে থানা থেকে এক ফোনকলে বলা হয়, জাহিদকে ছিনতাই করার অপরাধে আটক করা হয়েছে। আমার যেন পুরো পৃথিবী উলটে যায় খবরটা শুনে। বহু ঝামেলা করার পর বড় অংকের টাকা জরিমানা দিয়ে জাহিদকে থানা থেকে ছাড়াতে হয়। জরিমানার পুরো টাকাটা দিয়েছিলো রবিন! হ্যা, রবিন।

রবিন ওর স্ত্রীসমেত আমাদের বাসাতেই থাকে। ওর আবদার মোতাবেক আমি ওর জন্য পাত্রী পছন্দ করেছিলাম এবং সেই পাত্রীকেই ও বিয়ে করে। বড়কথা হল, চাকরি পাওয়ার পরপরই ও আমাকে বলেছিলো, “বাবা, আপনি সেলুনের কাজ করা ছেড়ে দিন। এই বয়সে আর কত মেহনত করবেন! আমার এখন নিজের পায়ে দাড়ানোর ব্যবস্থা হয়ে গেছে। এখন থেকে আপনাদের খেয়াল রাখার দায়িত্ব আমার।”

আমি শুরুতে ওর এ কথায় সায় দেই নি। আমার খুব লজ্জা লাগছিলো এই ভেবে যে, নিজের আপন সন্তানকে আমি মানুষের মতো মানুষ করতে পারিনি অথচ রবিন আমার অতিথি সন্তান হয়েও আমার দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত। অবশ্য ওর আকুল অনুরোধে মোহিত হয়ে অবশেষে ছেড়ে দিলাম সেলুনের কাজ। এরপর থেকে প্রায়ই দেখতাম আমার স্ত্রী লুকিয়ে কাদছে। কারন জিজ্ঞেস করলে বলে, “রবিনকে আজীবন আমি ভুল বুঝে গেছি। ভেবেছিলাম, ও শুধু আমাদের বাড়ির অন্নই ধ্বংস করবে। তাই ওর উপর কতই না অত্যাচার আর বাজে ব্যবহার করেছি আমি!! এখন ওর সামনে মুখ দেখাতেও আমার কলিজা ফেটে যায় লজ্জায়।”

জাহিদ ছিনতাই করে ধরা পড়ার পর ওর স্ত্রী ওকে ছেড়ে চলে যায়। জাহিদের অবস্থান এখন আমাদের বাসায়। ওর বুকে পাহাড় সমান হিংসা আর রাগ থাকা স্বত্ত্বেও বেহায়ার মতো ঘরে বেকার বসে থেকে রবিনের কামাই খেয়ে দিনকাল পার করছে। একদিকে রবিনের দিকে তাকালে আমার মন খুশিতে ভরে যায়, অন্যদিকে জাহিদের দিকে তাকালেই দুঃখের তাপে বুক পুড়ে যায়। বিষন্ন মনে ভাবি, এই একই ঘরে বড় হলো জাহিদ আর রবিন। তাহলে জাহিদের কেন এই দশা!? এর জন্য কি জাহিদ নিজেই দায়ী, নাকি আমিই বাবা হিসেবে ব্যর্থ?

___সমাপ্ত___

Source of kobitor

Leave a Reply

Translate »