গোপাল ভাড় এর জীবন বিস্ময়কর অজানা তথ্য ইতিহাস জেনে নিন জীবনী | Biography Of Gopal Bhar In Bangla

গোপাল এর আসল নাম,,শ্রিমান গোপাল চন্দ্র প্রামানিক

গোপাল ভাঁড় এর আসল পরিচয়

রস সম্রাট গোপাল ভাড় এমনই এক হাস্যকর গল্প চরিত্র, যা বাঙালির কাছে চিরণবিন। যার গল্প পড়লে হাসতে হাসতে আজও বাঙালির পেটে খিঁচ ধরে। ছোট থেকে বড় সকলেই ভালোবাসে গোপালের হাস্যকর এবং তীক্ষ্ণ বুদ্ধির গল্প পড়তে।

 

গোপাল ভাঁড়  বিখ্যাত হাস্যরসিক যিনি হাসি-ঠাট্টার মাধ্যমে অন্যদের আনন্দ দিতেন। বাংলার লোকসংস্কৃতিতে তাঁর একটি বিশেষ স্থান আছে। তিনি নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের (১৭১০-১৭৮৩) সভার অন্যতম সভাসদ ছিলেন বলে কথিত হয়।

গোপাল ছিলেন খুব বুদ্ধিমান এবং তাঁর উপস্থিত বুদ্ধি ছিল অত্যন্ত প্রখর। তিনি হাস্যরস সৃষ্টির মাধ্যমে রাজাকে সর্বদা খুশি রাখতেন এবং তাৎক্ষণিক যে-কোনো ব্যাপারে বাস্তব ঘটনাশ্রিত গল্পের মাধ্যমে গভীর শিক্ষণীয় বিষয় তুলে ধরতেন।

গোপাল ভাড়ের জীবনের পরিচয়
কৃষ্ণনগরের উত্তর দিকে ঘুর্নি নামের এক গ্রামে গোপাল ভাঁড়ের জন্ম। নয় বছর বয়সে তাঁর বাবা মারা যান। গরীব বলে লেখাপড়া করার সুযোগ হয়নি। কিন্তু অল্পশিক্ষা আর তাঁর নিজের অসীম বুদ্ধি ও প্রতিভার গুনেই তিনি আজও বাচ্চা বুড়ো সকলের মনে রয়ে গেছেন।

গোপাল ভাঁড় ছিলেন মধ্যযুগের একজন রম্যগল্পকার। তাঁর অপর নাম গোপাল ভাণ্ড। অষ্টাদশ শতাব্দিতে নদিয়া জেলার মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভায় তিনি ভাঁড় বা মনোরঞ্জনকারী ছিলেন। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র তাঁকে সভাসদদের মধ্যে অন্যতম নবরত্ন হিসেবে মর্যাদা দিয়েছিলেন।

 

অনেকে মনে করেন গোপাল নামে কেউ আদৌ ছিলেন না। তবে কোনো না কোনো বিদূষক রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের প্রিয়পাত্র হয়েছিলেন। সেরকম গোপাল নামে কোনো নাপিত বংশীয় কোনো ব্যক্তি থাকতে পারেন বলে অনেকের বিশ্বাস। গোপালের জন্ম বা জন্মস্থান কোথায় সেবিষয়ে কোথাও সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায় নি। এমনকি কৃষ্ণনগরের বাসিন্দা হিসেবে তার অবস্থানের বিষয়ে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। প্রায় দুইশো বছরের অধিক আবহমানকাল ধরে প্রচলিত তাঁর জীবনরসসমৃদ্ধ গল্পগুলো দুই বাংলার বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মুখরোচক গল্প হিসেবে সমাদৃত হয়ে আসছে। তাঁর বেশ কয়েকটি গল্প প্রবাদের মতো ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মধ্যযুগে খনার বচন যেমন প্রসিদ্ধ, তেমনই প্রসিদ্ধ গোপালের জীবনমুখী গল্পগুলো।

 

বলা বাহুল্য, হুগলির খানাকুল থেকে গোপালকে নবরত্ন হিসেবে নিয়ে এসেছিলেন মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র। দুই বাংলার রসের হাঁড়ি খ্যাত এই গোপাল ভাঁড় ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমান, দূরদর্শী ও বিচক্ষণ। তিনি তাঁর হাস্যরসের মধ্য দিয়ে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রকে সবসময় খুশি রাখতেন। উনবিংশ শতাব্দির বটতলার সাহিত্যে প্রথম গোপাল ভাঁড়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। দুই বাংলার ইতিহাসে, এমনকি সমগ্র পৃথিবীর ইতিহাসেও, অল্প হলেও দেখা যায় যে, সমষ্টিগতভাবে জনগণের উপস্থিত বুদ্ধি ও জ্ঞান কোনো অতীত লোকের নামে প্রচলিত হয় এবং কালক্রমে তিনিই হয়ে ওঠেন নায়ক। গোপাল ভাঁড় হয়ত এমনই কাল্পনিক ব্যক্তি। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের দেহরক্ষী হিসেবে শঙ্কর তরঙ্গ নামে এক ব্যক্তির উল্লেখ পাওয়া যায়। তাঁর সাহস, উপস্থিত বুদ্ধি ও জ্ঞানের জন্য রাজা অনেক সময় তাঁকে বিশেষ মর্যাদা দিতেন। হয়ত তিনি পরবর্তী কালে গোপাল ভাঁড় হিসেবে কল্পিত হয়েছেন।

 

Read More:  বাংলার ইতিহাসে হরিচাঁদ ঠাকুর ও গুরুচাঁদ ঠাকুরের আবদান

রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভাসদ ছিলেন মধ্যযুগের কবি ভারতচন্দ্র, রামপ্রসাদ সেন, জগন্নাথ তর্ক পঞ্চানন, হরিরাম তর্কসিদ্ধান্ত প্রমুখ।

রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভার অনেক রত্নের এক রত্ন ছিলেন গোপাল ভাঁড়—এমন বক্তব্য পণ্ডিতদের। এ বিষয়ে তাঁরা স্থির সিদ্ধান্তে না এলেও এই মতের পক্ষেই রয়েছে অধিকাংশের সায়। যেমন বঙ্গসাহিত্যে হাস্যরসের ধারা বইয়ে অজিতকুমার ঘোষ লিখেছেন, ‘গোপাল রসিক-চূড়ামণি মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের রাজসভার ভাঁড় ছিলেন।’

গোপাল ভাঁড়ের প্রায় সব গল্পই আত্মজীবনীমূলক। চরিত্র হিসেবে কতদিনের পুরোনো এই গোপাল ভাঁড়? খুব বেশি হলে ৩০০ বছর। নবদ্বীপ কাহিনি বা ‘মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র ও গোপাল ভাঁড়’ বইটির লেখক নগেন্দ্রনাথ দাস গোপাল ভাঁড়ের একটি বংশ-লতা প্রকাশ করেছিলেন। সেই তালিকায় গোপাল ভাঁড়ের পিতামহ, পিতা ও বড় ভাইয়ের নাম পাওয়া যায়। আর গোপাল ভাঁড়ের গল্পগুলোতে তার মা, স্ত্রী ও কন্যার প্রসঙ্গ রয়েছে নানাভাবে।

নগেন্দ্রনাথ দাস বলছেন, গোপাল ভাঁড় আসলে ছিলেন গোপালচন্দ্র নাই। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র তাকে রাজভাণ্ডারি হিসেবে নিয়োগ দিয়ে গোপালচন্দ্র ভাণ্ডারি হাস্যার্ণব উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। ওই ভাণ্ডারি শব্দটিরই অপভ্রংশ থেকে ভাঁড় হয়ে গেছে।

যতদূর জানা যায়, গোপালচন্দ্রের অসামান্য বুদ্ধি গুণে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র অনেকবার নবাব সরকারের কাছে ঘোর বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়েছিলেন। তার বাক্য প্রয়োগে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়া যায়। ভগবত ও পুরাণে তার যথেষ্ট দখল ছিল, রামায়ণ-মহাভারত আদ্যপান্ত ছিল তার মুখস্থ। এমনকি রাজনীতি ও সমাজনীতিতেও তিনি ছিলেন বিশেষ পারদর্শী। মহারাজের কৃপায় কৃষ্ণনগরের ধনী ব্যক্তি হিসেবে তাকে বিবেচনা করা হতো। উপরন্তু, তিনি ছিলেন ধর্মপরায়ণ ও চরিত্রবান। ফলে মহারাজা ও মহারাণী তাকে সন্তানের মতোই স্নেহ করতেন বলে গবেষকদের দাবি। গোপালের একটি ছেলে ও একটি মেয়ে ছিল। মেয়ের নাম রাধারানী। তার দুই পুত্র রমেশ ও উমেশ। কিন্তু তার এক পুত্রের খুব অল্প বয়সেই মৃত্যু হয়। গোপাল ভাঁড়ের বংশধর থাকেন কলকাতাতেই ।

 

কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, গোপালের বিয়ে ও মৃত্যু নিয়ে ইতিহাস ভীষণ চুপচাপ। তো, বহুচর্চিত এই রসিক সম্বন্ধে ইতিহাসের অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম কী বলেছেন, এবার টুকে নেওয়া যাক সেটুকু, কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের দেহরক্ষক হিসেবে শঙ্কর তরঙ্গ নামে এক ব্যক্তির উল্লেখ পাওয়া যায়। হয়ত তিনিই পরবর্তীকালে গোপাল ভাঁড় হিসেবে কল্পিত হয়েছেন।

রাজা কৃষ্ণচন্দ্র সব সভাসদদের সামনে গোপালকে জব্দ করার উদ্দেশ্যে বলছেন, “বুঝলে গোপাল, আমার সাথে তোমার চেহারার কিন্তু দারুণ মিল ! তা বাবার শাসনামলে তোমার মা কি এদিকে আসতেন-টাসতেন নাকি?” গদগদ হয়ে গোপাল বললেন, ‘আজ্ঞে না রাজামশাই। তবে মা না এলেও বাবা কিন্তু প্রায়শই আসতেন!’

 

গোপাল ভাঁড় বলে বাস্তবে কি সত্যিই কেউ ছিলেন ?

রাজা কৃষ্ণচন্দ্র সব সভাসদদের সামনে গোপালকে জব্দ করার উদ্দেশ্যে বলছেন, বুঝলে গোপাল, আমার সাথে তোমার চেহারার কিন্তু দারুণ মিল ! তা বাবার শাসনামলে তোমার মা কি এদিকে আসতেনটাসতেন নাকি? গদগদ হয়ে গোপাল বললেন, আজ্ঞে না রাজামশাই। তবে মা না এলেও বাবা কিন্তু প্রায়শই আসতেন!

গল্পটা পড়েই নিশ্চয়ই আর বুঝতে বাকি নেই, রাজামশাইকে এভাবে তীক্ষ্ণবুদ্ধির মার দেওয়া ব্যক্তিটি কে? গোপাল ভাঁড়, যার মাথায় টাকপড়া, পেট মোটা বেটে তীক্ষ্ণ বুদ্ধি সম্পন্ন চরিত্র। কিন্তু গোপাল ভাঁড় কি শুধুই একটা চরিত্র? নাকি বাস্তবে এরকম কেউ ছিলো? এসব প্রশ্নের উত্তর মিলানোর চেষ্টা করবো আজকে

গোপাল ভাঁড় এর আসল পরিচয়

বাংলা অঞ্চলের প্রবল প্রতাপশালী চরিত্র নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের (১৭১০৮৩) রাজত্বকাল ৫৫ বছরের। ১৮ বছর বয়সে তিনি যখন সিংহাসনে বসেন, তখন ১৭২৮ সাল। শাক্ত ধর্মে বিশ্বাসী কৃষ্ণচন্দ্র ছিলেন বিদ্যোৎসাহী শিল্পসাহিত্যানুরাগী। যদিও ১৭৫৭তে পলাশীর প্রেক্ষাপটে ইংরেজদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে উৎখাতের দায়ে ইতিহাসে তিনি বেইমান হিসেবে চিহ্নিত, তবু এতে শিল্পসাহিত্যের প্রতি তাঁর অনুরাগের কাহিনি মুছে যায় না। তাঁর সভাসদ ছিলেন মধ্যযুগের কবি ভারতচন্দ্র, রামপ্রসাদ সেন, জগন্নাথ তর্ক পঞ্চানন, হরিরাম তর্কসিদ্ধান্ত প্রমুখ।

এই কৃষ্ণচন্দ্রের সভার অনেক রত্নের এক রত্ন ছিলেন গোপাল ভাঁড়এমন বক্তব্য পণ্ডিতদের। বিষয়ে তাঁরা স্থির সিদ্ধান্তে না এলেও এই মতের পক্ষেই রয়েছে অধিকাংশের সায়। যেমন বঙ্গসাহিত্যে হাস্যরসের ধারা বইয়ে অজিতকুমার ঘোষ লিখেছেন, গোপাল রসিকচূড়ামণি মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের রাজসভার ভাঁড় ছিলেন।

রস সম্রাট গোপাল ভাড় এমনই এক হাস্যকর গল্প চরিত্র, যা বাঙালির কাছে চিরণবিন। যার গল্প পড়লে হাসতে হাসতে আজও বাঙালির পেটে খিঁচ ধরে। ছোট থেকে বড় সকলেই ভালোবাসে গোপালের হাস্যকর এবং তীক্ষ্ণ বুদ্ধির গল্প পড়তে। সেই গোপাল ভাঁড় বলে কি সত্যিই কেউ ছিলেন?

 

নদিয়ারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের সভায় বিদূষক হিসেবে গোপালের উপস্থিতি বাস্তবে ছিল বলে একাংশের ধারণা। আবার অনেকে বলে এমন কেউ বাস্তবে ছিলোনা। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভায় ছিল একাধিক ব্যক্তি । সেখান থেকেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে গোপাল ভারের চরিত্রটি। কিন্তু নগেন্দ্রনাথ দাস নামক এক বেক্তি দাবি করেছেন গোপাল ভারের কাহিনী আসলে সত্যি। ‘নবদ্বীপ-কাহিনী বা মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র ও গোপাল ভাঁড়’ নামে একটি বইও লিখে ফেলেন তিনি। এ বইয়ে তিনি জানাচ্ছেন, ‘ভাঁড়’ নয়, গোপালের পদবি ছিল ‘নাই’। তাঁর ঠাকুর্দা ছিলেন ‘আনন্দরাম নাই’ নামে এক পরম তান্ত্রিক সাধক। আর গোপালের বাবা দুলালচন্দ্র নাই, পেশায় ছিলেন নাপিত।

 

তবে, গোপালের বুদ্ধিতে মুগ্ধ হয়েই রাজা কৃষ্ণচন্দ্র তাঁকে সভার অন্যতম রত্ন হিসেবে স্থান দেন এবং তাকে ‘ভাণ্ডারী’ উপাধি উপহার হিসেবে দেন। ‘ভাণ্ডারী’ থেকেই সেটা হয় ‘ভাঁড়’। গোপাল ভাঁড়। নগেন্দ্রনাথ দাস বলেন, গোপাল ভারের একটি মেয়ে ছিল যার নাম ছিল রাধারানী। ভাঁড়ের বংশ লতিকাও তিনি তার সেই বইয়ে রেখেছেন। নগেন্দ্রনাথের বক্তব্য, তিনি গোপালের দাদা কল্যাণের পরবর্তী প্রজন্ম। সেই হিসেবে গোপালের একমাত্র বংশধর তিনি। তবে এই মত এখনো সব ঐতিহাসিক পুরোপুরি মেনে নিচ্ছেন না।

 

গোপাল ভাড়ের জীবনের পরিচয়

 

গোপালকে নিয়ে বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া, আর অন্যান্য সাইট ঘেঁটে যেসব তথ্য পাওয়া যায়, তা হলো – গোপাল ভাঁড়ের গল্প মুখে মুখে, লোককথায় বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে অনেকদিন থেকে চলে এলেও গোপালের নাম জনপ্রিয় হয় প্রধানত উনিশ শতকের প্রথম দিকে। সে সময় কলকাতার বটতলায় গোপালের প্রথম বই প্রকাশিত হয়। নদীয়ার স্বনামধ্য রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় -এর সভার ভাঁড় নানা সময় নানা সমস্যার সমাধান গল্পে গল্পে করে দিতেন। এজন্য তিনি রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের বিশেষ প্রিয়পাত্র ছিলেন।

তবে এই ইতিহাস নিয়েও সন্দেহ আছে। অনেক ইতিহাসবিদ বলেন, রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভায় গোপাল নামক কারো উপস্থিতির প্রমাণ কোনো দলিলে পাওয়া যায়নি। তো, গোপাল ভাঁড়ের অস্তিত্বের সন্ধান করতে গিয়ে গবেষকরা নানা প্রশ্ন তুলে ধরেছেন। গোপালের জন্ম কত বঙ্গাব্দে তা কোথাও লেখা নেই। তার জন্মস্থানের পক্ষেও কোনো নথি নেই। কৃষ্ণনগরের বাসিন্দা হিসেবে তার সম্পত্তির কিংবা জায়গা-জমির কোনো নথি পাওয়া যায় না। নগেন্দ্রনাথ দাস বিরচিত নবদ্বীপ কাহিনি দাবি করে, গোপালের বাবার নাম জানা গেলেও তার মা ও স্ত্রী সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি।

গোপালের ছবি কেউ কখনো দেখেনি। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের পঞ্চরত্নসভার রাজকবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর মহারাজ, তার রাজত্ব ও সভাসদদের নিয়ে যে কাব্যগ্রন্থ লিখে গেছেন সেখানেও তিনি গোপাল ভাঁড়ের কোনো নাম উল্লেখ করেননি। এমনকি কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির মহাফেজখানায় গোপালের অস্তিত্বের প্রমাণস্বরূপ কোনো দলিল দস্তাবেজ নেই।

তবে শুধুমাত্র কৃষ্ণনগর রাজবাড়িতে গোপালের ছবি বলে একটি অয়েল পেইন্টিং ঝোলানো রয়েছে, যেখানে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রও রয়েছেন। সেটি নিয়েও ঐতিহাসিক মহলে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। তার সময়ের কোনো বই-পুস্তক ইত্যাদিতেও গোপাল ভাঁড়ের কোনো নাম পাওয়া যায় না, এমনকি তার নিজের লেখাও কোনো বই নেই।

গোপাল ভাঁড়ের প্রায় সব গল্পই আত্মজীবনীমূলক। চরিত্র হিসেবে কতদিনের পুরোনো এই গোপাল ভাঁড়? খুব বেশি হলে ৩০০ বছর। নবদ্বীপ কাহিনি বা ‘মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র ও গোপাল ভাঁড়’ বইটির লেখক নগেন্দ্রনাথ দাস গোপাল ভাঁড়ের একটি বংশ-লতা প্রকাশ করেছিলেন। সেই তালিকায় গোপাল ভাঁড়ের পিতামহ, পিতা ও বড় ভাইয়ের নাম পাওয়া যায়। আর গোপাল ভাঁড়ের গল্পগুলোতে তার মা, স্ত্রী ও কন্যার প্রসঙ্গ রয়েছে নানাভাবে।
নগেন্দ্রনাথ দাস বলছেন, গোপাল ভাঁড় আসলে ছিলেন গোপালচন্দ্র নাই। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র তাকে রাজভাণ্ডারি হিসেবে নিয়োগ দিয়ে গোপালচন্দ্র ভাণ্ডারি হাস্যার্ণব উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। ওই ভাণ্ডারি শব্দটিরই অপভ্রংশ থেকে ভাঁড় হয়ে গেছে।

তো, গোপালের পদবী ছিলো ‘নাই’। ‘নাই’ শব্দের অর্থ নাপিত। হতেই পারে গোপাল ছিল নাপিত বংশজাত। ঐতিহাসিক ও ভাষাবিদ সুকুমার সেন এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘গোপাল ভাঁড় সম্পর্কে আধুনিক বাঙালির কৌতুহল থাকার ফলে বাস্তব অথবা কল্পিত ব্যক্তিটির সম্পর্কে যে জনশ্রুতি জাতীয় ঐতিহ্য গজিয়ে উঠেছে ও উঠছে তার বীজ হচ্ছে ভাঁড় নামের অংশটি। গোপাল ভাঁড়ের ভাঁড়টুকু সংস্কৃত শব্দ ভাণ্ডারের ‘ভাণ্ড’-জাত মনে করে অনেক গোপালের জাতি নির্ণয় করেছেন। নাপিতের জাতি ব্যবসায় ভাঁড়-ক্ষুর নিয়ে। সুতরাং গোপাল ভাঁড় নাপিত।’

যতদূর জানা যায়, গোপালচন্দ্রের অসামান্য বুদ্ধি গুণে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র অনেকবার নবাব সরকারের কাছে ঘোর বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়েছিলেন। তার বাক্য প্রয়োগে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়া যায়। ভগবত ও পুরাণে তার যথেষ্ট দখল ছিল, রামায়ণ-মহাভারত আদ্যপান্ত ছিল তার মুখস্থ। এমনকি রাজনীতি ও সমাজনীতিতেও তিনি ছিলেন বিশেষ পারদর্শী। মহারাজের কৃপায় কৃষ্ণনগরের ধনী ব্যক্তি হিসেবে তাকে বিবেচনা করা হতো। উপরন্তু, তিনি ছিলেন ধর্মপরায়ণ ও চরিত্রবান। ফলে মহারাজা ও মহারাণী তাকে সন্তানের মতোই স্নেহ করতেন বলে গবেষকদের দাবি। গোপালের একটি ছেলে ও একটি মেয়ে ছিল। মেয়ের নাম রাধারানী। তার দুই পুত্র রমেশ ও উমেশ। কিন্তু তার এক পুত্রের খুব অল্প বয়সেই মৃত্যু হয়।

কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, গোপালের বিয়ে ও মৃত্যু নিয়ে ইতিহাস ভীষণ চুপচাপ। তো, বহুচর্চিত এই রসিক সম্বন্ধে ইতিহাসের অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম কী বলেছেন, এবার টুকে নেওয়া যাক সেটুকু, কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের দেহরক্ষক হিসেবে শঙ্কর তরঙ্গ নামে এক ব্যক্তির উল্লেখ পাওয়া যায়। হয়ত তিনিই পরবর্তীকালে গোপাল ভাঁড় হিসেবে কল্পিত হয়েছেন।

গোপালের আরেকটি গল্প দিয়ে আজকের লেখার ইতি টানবো-
গোপাল একবার গ্রামের মোড়ল হয়েছিল। তো একদিন ভোরবেলায় এক লোক এসে ডাকতে লাগল, ‘গোপাল? গোপাল?’ গোপাল ভাঁড় কোনো উত্তর না দিয়ে শুয়েই রইল। এবার লোকটা চিৎকার করে ডাকতে লাগল, ‘মোড়ল সাহেব, মোড়ল সাহেব।’ এবারও গোপাল কোনো কথা না বলে মটকা মেরে শুয়ে রইল। গোপালের বউ ছুটে এসে বলল, ‘কী ব্যাপার, লোকটা মোড়ল সাহেব মোড়ল সাহেব বলে চেঁচিয়ে পড়া মাত করছে, তুমি কিছুই বলছ না!’ গোপাল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, ‘আহা, ডাকুক না কিছুক্ষণ, পাড়ার লোকজন জানুক আমি মোড়ল হয়েছি।’

 

 

গোপাল ভাঁড় (বা গোপাল ভান্ড) ছিলেন মধ্যযুগে নদিয়া অঞ্চলের একজন প্রখ্যাত রম্য গল্পকার, ভাঁড় ও মনোরঞ্জনকারী।[] তিনি অষ্টাদশ শতাব্দীতে নদিয়া জেলার প্রখ্যাত রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভায় নিযুক্ত ছিলেন।[] রাজা তাঁকে তাঁর সভাসদদের মধ্যকার নবরত্নদের একজন হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। সেই আমলে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের প্রাসাদের সামনে নির্মিত তাঁর একটি ভাস্কর্য এখনো সেখানে অবিকৃত অবস্থায় রয়েছে। পরবর্তীতে কৃষ্ণনগর পৌরসভার সীমানায় ঘূর্ণীতে গোপাল ভাঁড়ের নতুন মূর্তি স্থাপিত হয়েছে।

প্রায় দুইশত বছরেরও অধিক আবহমানকাল ধরে প্রচলিত তার জীবন-রস সমৃদ্ধ গল্পগুলো পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মাঝে, লোককথায় এখনো স্বমহিমায় টিকে আছে। কতগুলি গল্প প্রায় প্রবাদের ন্যায় ব্যবহৃত হয়। তাকে মোল্লা নাসিরুদ্দিন ও বীরবলের সমতুল্য হিসাবে পরিগণনা করা হয়।তাঁকে কেন্দ্র করে সনি আট টিভিতে গোপাল ভাঁড় নামে একটি এনিমেশন কার্টুন নির্মিত হয়ে প্রচারিত হচ্ছে।

ইতিহাস বিতর্ক[সম্পাদনা]

গোপাল ভাঁড় চরিত্রটি ঐতিহাসিক, গবেষক ও ভাষাবিদদের কাছে বিতর্কের বিষয় বহুকাল থেকে। গোপালের গল্পগুলি সমাজে চুড়ান্ত জনপ্রিয় ও বহুল প্রচলিত হলেও গোপাল ভাঁড় বাস্তবে ছিলেন কিনা সে নিয়ে মতভেদ আছে। অনেকেই মনে করেন গোপাল ভাঁড় নামে কেউ নির্দিষ্ট করে ছিলেননা। তবে কোনো না কোনো বিদূষক রাজার প্রিয়পাত্র হন। সেরকম গোপাল নাম্নী নাপিত বংশীয় কোনো ব্যক্তি ছিলেন। গোপালের জন্ম কত বঙ্গাব্দে তা কোথাও লেখা নেই। তার জন্মস্থানের পক্ষেও কোনো নথি নেই, কৃষ্ণনগরের বাসিন্দা হিসেবে তার সম্পত্তির কিংবা জায়গা-জমির কোনো প্রমান পাওয়া যায় না। গোপালের বাবার নাম জানা গেলেও তার মা ও স্ত্রী সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি। নগেন্দ্রনাথ দাসের মতে গোপালের পদবী ছিল ‘নাই’। মহারাজ তাকে হাস্যার্ণব উপাধী দান করেন। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও ভাষাবিদ সুকুমার সেন বলেছেন ‘গোপাল ভাঁড় সম্পর্কে আধুনিক বাঙালির কৌতুহল থাকার ফলে বাস্তব অথবা কল্পিত ব্যক্তিটির সম্পর্কে যে জনশ্রুতি জাতীয় ঐতিহ্য গজিয়ে উঠেছে উঠছে তার বীজ হচ্ছে ভাঁড় নামের অংশটি, গোপাল ভাঁড়ের ভাঁড়টুকু সংস্কৃত শব্দ ভাণ্ডারেরভাণ্ড’-জাত মনে করে অনেক গোপালের জাতি নির্ণয় করেছেন‘। পক্ষের ও বিপক্ষের যুক্তি যাই হোক, গোপাল ভাঁড় বাঙালি রসিক ও লৌকিক সংস্কৃতিতে অমলিন হয়ে আছেন[]

Read More: সদগুরু জাগ্গি বাসুদেব জীবনী | Biography of Sadhguru in Bangla

গোপাল ভাঁড়

জনশ্রুতি আছে নবাব আলীবর্দী খানকে রাজকর দিতে না পারায় ১৭৫৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি কারাগারে অন্তরীণ হন। সময়টা তখন দুর্গাপূজার কাছাকাছি। নবাবের কারাগার থেকে যখন তিনি মুক্ত হলেন, তখন কৃষ্ণনগর ফেরার পথে তিনি বুঝলেন বিজয়া দশমী চলছে। পথিমধ্যে নৌকায় তিনি ঘুমিয়ে পড়লে স্বপ্নে দেখেন এক রক্তবর্ণা চতুর্ভুজা কুমারী দেবী তাঁকে বলছেন আগামী কার্তিক মাসের শুক্লানবমী তিথিতে তাঁর পুজো করতে। ফলে প্রচলন হয় জগদ্ধাত্রী পূজার। এর পরের বছর চন্দননগরে জগদ্ধাত্রী পুজার প্রচলন হয় তার সুহৃদ ইন্দ্রনারায়ন চৌধুরীর হাত দিয়ে। এছাড়া মালোপাড়া জগদ্ধাত্রীর (মা জলেশ্বরী) প্রতিমা পূজার সূচনা করেন মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র।

গোপাল ভাঁড়  বিখ্যাত হাস্যরসিক ও ভাঁড়, যিনি হাসি-ঠাট্টার মাধ্যমে অন্যদের আনন্দ দিতেন। বাংলার লোকসংস্কৃতিতে তাঁর একটি বিশেষ স্থান আছে। তিনি নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের (১৭১০-১৭৮৩) সভার অন্যতম সভাসদ ছিলেন বলে কথিত হয়।

গোপাল ছিলেন খুব বুদ্ধিমান এবং তাঁর উপস্থিত বুদ্ধি ছিল অত্যন্ত প্রখর। তিনি হাস্যরস সৃষ্টির মাধ্যমে রাজাকে সর্বদা খুশি রাখতেন এবং তাৎক্ষণিক যে-কোনো ব্যাপারে বাস্তব ঘটনাশ্রিত গল্পের মাধ্যমে গভীর শিক্ষণীয় বিষয় তুলে ধরতেন। কিন্তু গোপাল ভাঁড়ের কোনো ঐতিহাসিক স্বীকৃতি নেই। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজত্ব সম্পর্কে ইতিহাসে প্রচুর তথ্য পাওয়া গেলেও তার কোথাও উল্লেখ নেই যে, তাঁর সভায় গোপাল নামে একজন ভাঁড় ছিলেন।

উনিশ শতকের প্রথম দিককার বটতলার সাহিত্যে গোপাল ভাঁড়ের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। বাংলার ইতিহাস, এমনকি পৃথিবীর ইতিহাসেও, অল্প হলেও দেখা যায় সমষ্টিগতভাবে জনগণের উপস্থিত বুদ্ধি ও জ্ঞান কোনো একজন অতীত লোকের নামে প্রচলিত হয় এবং কালক্রমে তিনি জনগণের মধ্যে হিরো হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। গোপাল ভাঁড় হয়ত এমনি এক কাল্পনিক ব্যক্তিত্ব। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের দেহরক্ষক হিসেবে শঙ্কর তরঙ্গ নামে এক ব্যক্তির উল্লেখ পাওয়া যায়। তাঁর সাহস, উপস্থিত বুদ্ধি ও জ্ঞানের জন্য রাজা তাঁকে বিশেষ মর্যাদা দিতেন। হয়ত তিনিই পরবর্তীকালে গোপাল ভাঁড় হিসেবে কল্পিত হয়েছেন। তবে কাল্পনিক বা বাস্তব যা-ই হোক, গোপাল ভাঁড় বাংলা লোকসাহিত্য-এর একজন বিশেষ ব্যক্তিত্ব। [সিরাজুল ইসলাম]

গোপাল ভাড়ের জীবনের পরিচয় ঃঃঃ
কৃষ্ণনগরের উত্তর দিকে ঘুর্নি নামের এক গ্রামে গোপাল ভাঁড়ের ন্ম। নয় বছর বয়সে তাঁর বাবা মারা যান। গরীব বলে লেখাপড়া করার সুযোগ হয়নি। কিন্তু অল্পশিক্ষা আর তাঁর নিজের অসীম বুদ্ধি ও প্রতিভার গুনেই তিনি আজও বাচ্চা বুড়ো সকলের মনে রয়ে গেছেন।

Tags: গোপাল ভাঁড়ের আসল ছবি, গোপাল ভাঁড়ের কাহিনী, গোপাল ভাঁড়ের মৃত্যুদণ্ড, গোপাল ভাঁড়ের বউ এর নাম কি, গোপাল ভাঁড়ের বংশধর, গোপাল ভাঁড়ের বাড়ি, গোপাল ভার বাংলা কার্টুন, গোপাল ভাঁড় এর জন্ম কত সালে,gopal bhar real life story, how raja krishnachandra died, gopal bhar cartoon voice artist name, gopal bhar voice, artist name ,gopal bhar birthday date, gopal bhar sony aath voice artist, gopal bhar star jalsha serial cast name

ডেইলি নিউজ টাইমস বিডি ডটকম (Dailynewstimesbd.com)এর ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব ও ফেসবুক পেইজটি ফলো করুন করুন।

One thought on “গোপাল ভাড় এর জীবন বিস্ময়কর অজানা তথ্য ইতিহাস জেনে নিন জীবনী | Biography Of Gopal Bhar In Bangla

Leave a Reply

Translate »