লাল কেল্লায় বন্দি ছিলেন শাহ জাহান, সমাহিত হন তাজমহলে: ক্ষমতার দখল নিয়ে মোগলদের দীর্ঘ রক্তাক্ত দ্বন্দ্বের আখ্যান

বিজেপির নেতারা দাবি করছেন—মোগল স্থাপত্য তাজমহল আসলে এক শিব মন্দির। এই বিতর্ক নিয়ে গোটা উপমহাদেশ সরগরম। ভারতবর্ষে প্রায় ২০০ বছর প্রবল প্রতাপে রাজত্ব করেছে মোগলরা। এই রাজবংশের ইতিহাস ভরপুর নানা চমকপ্রদ আখ্যানে। এই সাম্রাজ্যকে ঘিরে বোনা হয়েছে অসংখ্য মিথের জাল। প্রায় শুরু থেকেই ক্ষমতার দখল নিয়ে মোগলরা নিজেদের মধ্যে রেষারেষি, হানাহানি করেছে। ভাইয়ের রক্তে হাত রাঙিয়েছে ভাই। পিতাকে বন্দি করেছে পুত্র। চলুন জেনে নেওয়া যাক মোগলদের অন্তর্দ্বন্দ্বের আখ্যান
বেশ কিছুদিন ধরেই তাজমহল নিয়ে সরগরম ভারত। দেশটির কয়েকটি কট্টরপন্থী হিন্দু সংগঠনের দাবি, গড়া হয়েছে হিন্দুদের শিবমন্দিরের ওপর। তাদের দাবি, আজকের তাজমহল আসলে নির্মিত হয় ‘তেজো মহালয়’ নামে এক প্রাচীন শিবমন্দিরের ওপর।

এ নিয়ে মামলাও করেছে তারা এলাহাবাদ হাই কোর্টে। তাজমহলের মধ্যে হিন্দু দেব-দেবীর মূর্তি আছে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখার জন্য কেন্দ্রীয় আর্কিওলজিকাল সার্ভে অভ ইন্ডিয়াকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়ার আর্জি জানানো হয়েছে সে মামলায়। জয়পুর রাজপরিবারের সদস্য ও বিজেপির সাংসদ দিয়া কুমারীর দাবি, তাজমহল যে জমিতে তৈরি করা হয়েছে, সেটি তাদের ছিল। যদিও তাজমহলের কক্ষ খোলার দাবি নাকচ করে দিয়েছেন আদালত।

মোগল সাম্রাজ্যের স্থাপত্য উৎকর্ষের অনন্য নিদর্শন তাজমহল। ভারতবর্ষের ইতিহাস লিখতে গেলে অবধারিতভাবেই চলে আসবে মোগল সাম্রাজ্যের কথা। প্রায় ২০০ বছর প্রবল প্রতাপে রাজত্ব করেছে মোগলরা। মোগলদের চেয়ে বেশি জমকালো শাসনকাল সম্ভবত আর কোনো রাজবংশেরই ছিল না। এই রাজবংশের ইতিহাস ভরপুর নানা চমকপ্রদ আখ্যানে। এই সাম্রাজ্যকে ঘিরে বোনা হয়েছে অসংখ্য মিথের জাল। প্রায় শুরু থেকেই ক্ষমতার দখল নিয়ে মোগলরা নিজেদের মধ্যে রেষারেষি, হানাহানি করেছে। ভাইয়ের রক্তে হাত রাঙিয়েছে ভাই। পিতাকে বন্দি করেছে পুত্র। চলুন জেনে নেওয়া যাক মোগলদের অন্তর্দ্বন্দ্বের আখ্যান।
ফারগানা থেকে এসে দিল্লির মসনদ দখল

ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্যের পত্তন সম্রাট জহির-উদ-দীন মুহম্মদ বাবুরের হাতে। যতটা সহজে বলা হয়ে গেল, তত সহজে কিন্তু বাবুর দিল্লি জয় করতে পারেননি।

দিল্লিতে বিজয়ের ঝাণ্ডা ওড়ানোর আগে তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ পথ। তার বাবা ছিলেন ছোট্ট পাহাড়ি রাজ্য ফারগানার শাসক। পিতার দিক বাবুর ছিলেন মোঙ্গল বীর তৈমুর লং, আর মায়ের দিক থেকে চেঙ্গিজ খানের বংশধর। মোঙ্গল থেকেই পরে তার রাজবংশের নাম হয়েছে মোগল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রবেশপত্র ডাউনলোড ২০২২

বাবা মারা যাবার পর, ১৪৯৪ সালে, মাত্র এগারো বছর বয়সে ফারগানার সিংহাসনে বসেন বাবুর। বাবুরের বসবাস ছিল যুদ্ধবাজ জাতির মধ্যে। তাই তাকে রাজ্যরক্ষার জন্য প্রতিনিয়ত লড়াইয়ের মধ্যে থাকতে হতো। কিন্তু একসময় তিনি সাম্রাজ্যের দখল হারান।

ফারগানা হারিয়ে বাবুর হিন্দুকুশ পেরিয়ে ১৫০৪ সালে কাবুলে চলে যান। কিন্তু সেখানকার রাজস্ব কম আদায় হওয়ায় তিনি নজর দেন ভারতবর্ষ তথা হিন্দুস্তানের দিকে। এরপর ১৫২৬ সালে হামলা চালান হিন্দুস্তানে।

পানিপথের প্রথম যুদ্ধে দিল্লির সুলতান ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত করে ভারতবর্ষে মোগল শাসনের সূচনা করেন বাবুর।

মানুষ হিসেবে বাবুর ছিলেন ক্ষমাশীল ও বন্ধুসুলভ। স্বভাবে তৈমুরী নৃশংসতা থাকলেও তিনি ছিলেন কবি। আর তার মধ্যে ছিল প্রবল পুত্রস্নেহ। জ্যেষ্ঠ ছেলে হুমায়ুনকে তিনি প্রচণ্ড ভালোবাসতেন।

ক্ষমতার দখল নিয়ে হানাহানির শুরু

বাবুরের পর, ১৫৩০ সালে সিংহাসনে বসেন হুমায়ুন। তিনি ছিলেন পিতার যোগ্য উত্তরাধিকারী। পানিপথের যুদ্ধে তরুণ হুমায়ুন পিতার পাশে থেকেই দিল্লি বিজয়ে অংশ নেন।

যোদ্ধা হিসেবে তিনি যেমন ঝানু ছিলেন, তেমনি মানুষ হিসেবেও ছিলেন চমৎকার। গোয়ালিয়রের এক রাজপরিবারের সম্মান রক্ষার জন্য কৃতজ্ঞতার নিদর্শন হিসেবে সেই রাজপরিবার তাকে একটি হীরা উপহার দেয়। ওই হীরাটিই পরে কোহ-ই-নূর নামে বিখ্যাত হয়ে ওঠে।

মৃত্যুর আগে বাবুর হুমায়ুনকে বলে যান তিনি যেন তার ভাইদের সঙ্গে কখনও নিষ্ঠুর আচরণ না করেন। কিন্তু হুমায়ুনের শাসনকাল থেকেই মোগল বংশে শুরু হয়ে যায় সিংহাসনের দখল নিয়ে অন্তর্দ্বন্দ্ব। সৎ ভাইদের সিংহাসনে বসানোর জন্য ষড়যন্ত্র শুরু করেন হুমায়ুনের সৎ মায়েরা।

তাই সিংহাসন ও সাম্রাজ্যের ভারসাম্য ধরে রাখার স্বার্থে ভাইদের প্রতি কঠোর হতে বাধ্য হন হুমায়ুন। এ কারণে ইতিহাসের একটি ধারা হুমায়ুনকে নিষ্ঠুর হিসেবে আখ্যায়িত করে।

মাহমুদুর রহমানের মোগলনামা ১ম খণ্ড জানাচ্ছে, মোগল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে সর্বপ্রথম অন্তঃবিদ্রোহ করেন হুমায়ুনের ছোট ভাই কামরান মির্জা। হুমায়ুনের কয়েক মাসের ছোট কামরান প্রথমে ভাইকে হত্যার পরিকল্পনা করতে গিয়ে ধরা পড়েন। তার প্ররোচনায় ষড়যন্ত্রে যোগ দিয়েছিলেন বাকি দুই ভাইও। তবে ধরা পড়ার পরও হুমায়ুন ভাইদের ক্ষমা করে দেন। শুধু তা-ই নয়, ‘শাস্তি হিসেবে’ তাদেরকে নিযুক্ত করেন বিভিন্ন প্রদেশের শাসক হিসেবে!

কিন্তু তাতেও কামরানের সিংহাসনের আকাঙ্ক্ষা মিটল না। নানা সময়ে নানাভাবে তিনি হুমায়ুনের শাসনকাজে সমস্যা সৃষ্টি করতে থাকেন।
অবশেষে চূড়ান্ত বিশ্বাসঘাতকতা করে বসেন কামরান। একবার লাহোরে অবস্থান করে শের শাহ-র বিরুদ্ধে অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন হুমায়ুন। তখন কামরান তাকে প্রয়োজনীয় সেনা-সহায়তা দিতে অস্বীকৃতি জানান। শুধু তা-ই নয়, শের শাহকে চিঠি দিয়ে কামরান জানান যে, তিনি হুমায়ুনকে শের শাহর হাতে তুলে দিতে প্রস্তুত।

ভাইয়ের বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়ে হুমায়ুনকে পালাতে হয়। এই যাযাবর জীবন কাটানোর সময়ই জন্ম হয় তার ছেলে আকবরের। এই সময় একদিন শিশু আকবরকে অপহরণ করেন কামরান।

এরপর ইরানের শাহ তামাস্পের সহায়তায় সিংহাসন পুনরুদ্ধার করেন হুমায়ুন। ভাই কামরানের কাছ থেকে উদ্ধার করেন শিশুপুত্র আকবরকেও।

এবার আর কামরানকে ক্ষমা করেননি হুমায়ুন। প্রথমে কামরানকে অন্ধ করে দেন, তারপর তাকে পাঠিয়ে মক্কায়। ঘরের শত্রু বিভীষণকে নির্বাসনে পাঠিয়ে প্রথমে লাহোর, তারপর দিল্লি জয় করেন তিনি।

বাকি জীবন মোটামুটি নির্বিঘ্নেই রাজত্ব করেন হুমায়ুন। তার মৃত্যু হয় দুর্ঘটনায়। এক সন্ধ্যায় বইপ্রেমী হুমায়ুন দাঁড়িয়ে ছিলেন নিজের পাঠাগারের ছাদে। মাগরিবের আজান শুনে সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নামতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে যান। তাতে মাথার খুলি ফেটে যায় হুমায়ুনের। কয়েকদিন চিকিৎসার পর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

সম্রাট হুমায়ুন শুধু যে দক্ষ শাসক ছিলেন তা-ই নয়, তিনি ছিলেন খুব খেয়ালি মানুষও। উদাহরণ হিসেবে একটা ঘটনার কথা বলা যায়। একবার জীর্ণ পোশাক পরা এক যুবক সম্রাট হুমায়ুনের সঙ্গে দেখা করতে চাইল। যুবক শুধু সম্রাটের দেখাই পায়নি, তার সঙ্গে পায় এক অভাবনীয় পুরস্কার! ওই যুবকের নাম নিজাম। ভিস্তিওয়ালা। চৌসার যুদ্ধে সম্রাট হুমায়ুনের জীবন বাঁচিয়েছিল এই যুবক। সে সময় হুমায়ুন নিজামকে কথা দিয়েছিলেন, তাকে একদিনের সম্রাট করবেন। পরে ওই যুবক ঠিকই রাজদরবারে গিয়ে হাজির হয় একদিনের সম্রাট হওয়ার জন্যে। হুমায়ুন কিন্তু তার প্রতিশ্রুতি ভোলেননি। তিনি ঠিকই নিজামকে সিংহাসনে বসিয়ে একদিনের সম্রাট করেন। ওই দিন নিজামের জারি করা সমস্ত ফরমান রাজকীয় ফরমান হিসেবে গণ্য ও পালন করা হয়।

আকবর: মোগল যুগে নতুন হাওয়া

১৫৫৬ সালে সিংহাসনে বসেন হুমায়ুনের পুত্র জালাল-উদ-দীন মোহাম্মদ আকবর।

সম্রাট আকবর ছিলেন বহু ‘নতুন’ কিছুর প্রণেতা। তার সময় মোগল সাম্রাজ্যের আকারও বাড়ে। সাম্রাজ্যের ভিত শক্ত করার জন্য তিনি বীর রাজপুত গোত্রের রাজা বিহারীমলের কন্যা হীরা বাঈকে বিয়ে করলেন। আত্মীয়তার মাধ্যমে সম্পর্ক দৃঢ় করতে চাইলেন প্রতিপক্ষের সঙ্গে। কিন্তু হিন্দু রাজকুমারীকে বিয়ে করায় অসন্তুষ্ট হলেন আকবরের দরবারের মোল্লারা। নাখোশ হলো হিন্দুরাও। এমনকি স্বয়ং হীরা বাঈও আকবরের সঙ্গে এ বিয়ে মন থেকে মেনে নিতে পারেননি।

তবে শত্রুতা ও ধর্মবিভেদ কাটিয়ে ওঠার জন্য আকবরের নেওয়া এ কৌশল ভালোই কাজে দিয়েছিল। বীর রাজপুতরা মোগলদের পক্ষে এসে আকবরের শক্তি বাড়িয়ে তোলে।

আকবরও বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়েছিলেন তার কাছের মানুষদের থেকে। প্রথমজীবনের অভিভাবক বৈরাম খাঁ একসময় তার বিরুদ্ধে চলে যান। তারপর আকবরের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেন তার দুধ-মা আর তার দুধ-ভাইও।

তবে আকবর সবকিছু সামলে দক্ষতার সাথে সাম্রাজ্য পরিচালনা করেন। তার দরবারে অনেক বিখ্যাত মানুষের আগমন ঘটে। যেমন—ইতিহাসের বিখ্যাত ভাঁড় বীরবল আকবরের দরবারের লোক ছিলেন বলে জানা যায় মাহমুদুর রহমানের মোগলনামা ১ম খণ্ড থেকে। তাছাড়া কিংবদন্তিতুল্য গায়ক তানসেনও ছিলেন আকবরের দরবারের শিল্পী।

সম্রাট আকবর অনেক নতুন প্রথারও প্রবর্তক। ১৫৮২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি সব প্রধান প্রধান ধর্মের নির্যাস নিয়ে প্রবর্তন করেন নতুন ধর্মমত ‘দ্বীন-ই-ইলাহী’। এছাড়া ‘ঐশ্বর্যে পূর্ণ নরক’, অর্থাৎ বাংলা থেকে রাজস্ব সংগ্রহের সুবিধার্থে তিনি বাংলা সনেরও প্রবর্তন করেন।

ক্ষমতার জন্য অন্তর্কোন্দলে নাম লেখান আকবরের ছেলেও। ১৬০১ সালে পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসেন শাহজাদা সেলিম। মোগল সাম্রাজ্যে পিতার বিরুদ্ধে পুত্রের বিদ্রোহের ঘটনা এটাই প্রথম।

তখন ১৫৯৯ সাল। ৪৩ বছর ধরে মোগল সাম্রাজ্য শাসন করছেন আকবর। এই সময়ে মোগল সাম্রাজ্য নামে, যশে, ক্ষমতায়, সম্পদে পরিপূর্ণ।

শাহজাদা সেলিম এখন ৩২ বছরের যুবক। সিংহাসনে বসার জন্য ছটফট করছেন গত প্রায় দেড় দশক ধরে। কিন্তু আকবরের বয়স সাতান্ন হলেও শারীরিকভাবে তিনি অত্যন্ত মজবুত। কাজেই নিকট ভবিষ্যতে সিংহাসনে বসার সম্ভাবনা সেলিমের সামনে ছিল না। তাই তিনি হয়ে পড়েন হতাশ আর মরিয়া। সেই হতাশা আর সুযোগসন্ধানী দোসরদের প্ররোচনা ও ক্ষমতার তৃষ্ণায় পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসেন তিনি।

কিন্তু সেই বিদ্রোহ ব্যর্থ হয়। সেলিম এলাহাবাদে পালিয়ে গিয়ে নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করেন। পরে অনেকটা নিমরাজি হয়েই সিংহাসনের একমাত্র উত্তরাধিকারী সেলিমকে ক্ষমা করে দেন আকবর।

পরিবারের মধ্যে ক্ষমতার জন্য এই দ্বন্দ্ব অব্যাহত থাকে পরের প্রজন্মেও। পরবর্তীতে সেলিমের ছেলে খুসরোও দাঁড়িয়ে যান বাবার বিরুদ্ধে। সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে তীব্র রেষারেষি শুরু হয় সেলিম আর খুসরোর মধ্যে।

তবে ১৬০৫ সালে শ্রেষ্ঠ মোগল সম্রাট আকবর মৃত্যুশয্যায় সেলিমকেই উত্তরাধিকার ঘোষণা করেন।

জাহাঙ্গীর

আকবরের মৃত্যুর আগেই, আটত্রিশ বছর বয়সে, সিংহাসনে বসেন শাহজাদা সেলিম। রাজ্যাভিষেকের পর নূর-উদ-দীন মুহম্মদ জাহাঙ্গীর নাম গ্রহণ করেন।

সিংহাসনে বসে সেলিম প্রথমেই তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের শায়েস্তা করার বুদ্ধি বের করেন। এর সঙ্গে সঙ্গে তিনি সাম্রাজ্যের প্রজা এবং অমাত্যদের জন্য বারোটি নিয়ম প্রবর্তন করেন।

সিংহাসনে বসার পর সেলিম নিজেকে দক্ষ শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি মানুষের কল্যাণে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেন। সেসবের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে—কেউ কারও বাড়িতে জোরপূর্বক অবস্থান করতে পারবে না, কোনো অপরাধে কারও নাক-কান কাটা যাবে না, দুস্থ প্রজার জমি যেন মহাজন কেড়ে নিতে না পারে সে ব্যবস্থা নেওয়া প্রভৃতি।
এছাড়া জাহাঙ্গীর তৈরি করেন ‘ন্যায়ের জিঞ্জির’। স্বর্ণনির্মিত এই শিকলের এক প্রান্ত লাগানো ছিল শাহ বুর্জে, অপর প্রান্ত আটকে দেওয়া হয়েছিল নদীর তীরে একটি স্তম্ভের সাথে। শেকলের সঙ্গে বাঁধা ছিল ৬০টি ঘণ্টা। কেউ যদি মনে করত সে ন্যায় বিচার পায়নি, তাহলে এই শেকল ধরে নাড়ালে ঘণ্টার আওয়াজ সম্রাটের কানে পৌঁছত এবং তিনি সরাসরি সেখানে হস্তক্ষেপ করতেন।

আগেই বলা হয়েছে, ক্ষমতার জন্য জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন তার ছেলে খুসরোও। সিংহাসনে বসার পর জাহাঙ্গীর তাকে বাংলার শাসক করে সেখানে পাঠিয়ে দেন।

কিন্তু খুসরো আর তার সমর্থকরা তাতেও দমে যায়নি। সুদূর বাংলায় বসেই আগ্রার সিংহাসনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়।

১৬০৬ সালের ৬ এপ্রিল শাহজাদা খুসরো ৩৫০ ঘোড়সওয়ার নিয়ে সেকেন্দ্রায় আকবরের সমাধিতে যাওয়ার কথা বলে বের হন। কিন্তু তিনি মথুরার গিয়ে মিলিত হন হুসেন বেগের সঙ্গে। তারপর হাজার তিনেক ঘোড়সওয়ার নিয়ে চলে যান লাহোরে। পথে সঙ্গী করে নেন লাহোরের দিওয়ান আবদুর রহীমকে। লাহোরে পৌঁছে লাহোর দুর্গ অবরোধ করেন খুসরো ও তার বাহিনী।

ছেলের কাণ্ডের খবর পেয়ে নিজেই খুসরোকে ধাওয়া করেন জাহাঙ্গীর। তার সামনে খুসরোর বাহিনী টিকতে পারল না। পালানোর সময় জাহাঙ্গীরের সৈন্যদের হাতে ধরা পড়েন তিনি।

পুত্রের এই বিদ্রোহের কঠিন শাস্তি দেবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন সম্রাট জাহাঙ্গীর। তার আদেশে অসংখ্য গাছ কেটে শূল তৈরি করে খুসরোর সমর্থকদের সেই শূলে চড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তারপর খুসরোকে হাতির পিঠে বসিয়ে সার সার শূলের মাঝখান দিয়ে নিয়ে যান জাহাঙ্গীর। উদ্দেশ্য, খুসরো যাতে মৃতদেহ ও মৃত্যুপথযাত্রী মানুষদের আর্তনাদ শুনতে পারেন।

জাহাঙ্গীর তার আত্মজীবনীতে বলেছেন, এই বীভৎস শাস্তির উদ্দেশ্য ছিল খুসরোকে বোঝানো যে, এই মানুষগুলোর এই ভয়াবহ পরিণতির জন্য তার হঠকারিতাই দায়ী। এতেই খুসরোর মনোবল ভেঙে যায়। আর সুরক্ষিত হয় জাহাঙ্গীরের সিংহাসন।

কিন্তু মনোবল ভেঙে গেলেও খুসরোর হঠকারী স্বভাব বদলাল না। লাহোর বিদ্রোহের পরের বছরই ফের বিদ্রোহ করে বসেন তিনি। এবার কঠোর শাস্তি দেন জাহাঙ্গীর। ক্ষমতা সুসংহত করার জন্য ছেলেকে অন্ধ করে দেন তিনি।

১৬১১ সালে মেহেরুন্নিসার সঙ্গে বিয়ে হয় সম্রাট জাহাঙ্গীরের। মেহেরুন্নিসাকে বিয়ে করার আগে জাহাঙ্গীর ১৯ টি বিয়ে করেন, কিন্তু পরে আর একটি বিয়েও করেননি। বিয়ের পর মেহেরুন্নিসাকে প্রথমে ‘নূর মহল’ ও পরে ‘নূর জাহান’ উপাধি দেন জাহাঙ্গীর। মেহেরুন্নিসা অমরত্ব পেয়ে গেছেন নূর জাহান নামেই।

কথিত আছে, পর্দার আড়াল থেকে মোগল সাম্রাজ্য চালাতেন দৃঢ়চেতা নূর জাহানই। উপস্থিত বুদ্ধি, বিচক্ষণতা, কূটনীতি ও জাহাঙ্গীরের ভালোবাসার গুণে তিনি হয়ে ওঠেন মোগল সালতানাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নারী। তিনি ছিলেন বিদুষী নারী, নিপুণ নকশাকার। এমনকি তাজমহলেও রয়েছে নূর জাহানের নকশার ছাপ।

শাহ জাহান: ভ্রাতৃহত্যার শুরু যার হাতে

জাহাঙ্গীরের জীবদ্দশায়ই তার উত্তরাধিকারের দখল নিয়ে লড়াই শুরু হয় তার সন্তানদের মধ্যে। খুসরোকে শাহ জাহান অন্ধ করে দিলেও সিংহাসনে বসার পাঁয়তারা করছিলেন তার তৃতীয় ছেলে খুররমও। ১৬২০ সালে তাকে কাংড়া অভিযানে পাঠান জাহাঙ্গীর। এ অভিযানে তিনি বাবার কাছে বলেকয়ে ভাই খুসরোকে নিজের হেফাজতে নিয়ে যান।

কিন্তু ১৬২২ সালে খুররমের তত্ত্বাবধানে থাকা অবস্থায়ই মারা যান খুসরো। তার মৃত্যু নিয়ে নানা কথা বলা হয় সম্রাটকে। খুররম জানান, খুসরো মারা গেছেন শূল বেদনায় আক্রান্ত হয়ে। কিন্তু খুসরোর মৃতদেহ দেখে মনে হয়েছিল তাকে গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে। অধিকাংশ ইতিহাসবিদদেরও বিশ্বাস, খুররমই খুসরোকে হত্যা করান ক্ষমতায় যাওয়ার পথ মসৃণ করতে।

এই হত্যার মাধ্যমে এক কলঙ্কিত অধ্যায়ের সূচনা হয় মোগল ইতিহাসে। এ রাজবংশের শুরু থেকেই অন্তর্দ্বন্দ্ব চলে আসছিল। প্রথমে বাবুরের ছেলে কামরান বিদ্রোহ করেন হুমায়ুনের বিরুদ্ধে। তারপর আকবরের বিরুদ্ধে সেলিম, এরপর জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন খুসরো। কিন্তু এতদিন মোগল বংশের কেউ পরিবারের সদস্যের রক্তে হাত রাঙায়নি। কিন্তু খুররমের হাতে প্রাণ দিতে হলো ভাইকে।

অন্যদিকে নূর জাহানও কলকাঠি নাড়তে থাকেন নিজের পছন্দের লোককে সিংহাসনে বসানোর জন্যে। ১৬২২ সালে নূর জাহানের ইশারায় খুররমকে কান্দাহার উদ্ধারে যেতে আদেশ করেন জাহাঙ্গীর। কিন্তু খুররম ষড়যন্ত্রের গন্ধ পেয়ে বিশ্রামের অজুহাত দিয়ে অন্য কাউকে পাঠাতে বলেন সে অভিযানে। অবাধ্য হওয়ার কারণে নূর জাহানের ইন্ধনে খুররমের মনসব কেড়ে নেওয়া হয়। বাতিল করা হয় তার দাক্ষিণাত্যের সুবেদারী।

রাজকীয় ফরমান পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্রোহ করেন খুররম। মোগল বাহিনীর তাড়া খেয়ে বিদ্রোহী খুররম গুজরাট, গোলকুণ্ডা হয়ে বাংলায় পালান। নানা জায়গায় পালিয়ে বেড়াতে বেড়াতে একসময় ক্লান্ত হয়ে ওঠেন খুররম। শেষে আগ্রা পৌঁছে কৌশলে বাবার সঙ্গে দেখা করে ক্ষমা চান। জাহাঙ্গীরও জানতেন, খুররমই সিংহাসনে বসার জন্য সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি। তাই খুররমকে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু আগ্রা কেল্লায় ছেলেকে নজরবন্দি করেন।
জাহাঙ্গীর মারা যান ১৬২৭ সালে। তার মৃত্যুর পর সিংহাসনের দখল নিয়ে শুরু হয় নিষ্ঠুর খেলা। ওই সময় জাহাঙ্গীরের চতুর্থ পুত্র শাহরিয়ারকে সম্রাট ঘোষণা করেন নূর জাহান। তিনি চেয়েছিলেন শাহরিয়ারের মাধ্যমে নিজেই পর্দার আড়াল থেকে রাজ্য শাসন করবেন।

কিন্তু খুররম ছিলেন অত্যন্ত চতুর মানুষ। তিনি কৌশলে প্রভাবশালী অমাত্যদের নিজের পক্ষে টানতে থাকেন। আর তার ইশারায় হত্যা করা হয় শাহরিয়ারসহ সিংহাসনের আরও ছয় দাবিদারকে।

এরপর সিংহাসনের দাবিদার বেঁচে রইলেন মাত্র একজন—খুররম।

১৬২৮ সালে, ৩৬ বছর বয়সে, মোগল সাম্রাজ্যের পঞ্চম সম্রাট হিসেবে রাজ্যাভিষেক হয় শাহাব-উদ-দীন মোহাম্মদ খুররমের। সিংহাসনে বসার পর তিনি শাহ জাহান নাম নেন।

ক্ষমতায় বসার পর নূর জাহানকে লাহোরে পাঠিয়ে দেন শাহ জাহান। তিনি ছিলেন একাধারে শাহ জাহানের সৎ মা এবং তার প্রিয়তম স্ত্রী মমতাজ মহলের ফুফু। তাই তাকে এরচেয়ে কঠোর শাস্তি দেননি সম্রাট। শেষ জীবনটা লাহোরে, স্বামী জাহাঙ্গীরের সমাধির কাছেই অত্যন্ত সাদামাটাভাবে কাটিয়ে দেন নূর জাহান।

ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ পথ পেরিয়ে সিংহাসনে বসেন শাহ জাহান। কিন্তু সিংহাসনে বসার পরপরই আরও দু-দুটো বিদ্রোহ সামাল দিতে হয় তাকে। সেইসঙ্গে আঘাত হানে ভয়াবহ মহামারি।

কিন্তু সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে ১৬৩১ সালে। ওই বছরই চোদ্দতম সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান শাহ জাহানের প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজ মহল।

প্রিয়তমা স্ত্রীর মৃত্যুতে ভীষণ মুষড়ে পড়েন শাহ জাহান। তার সঙ্গে মমতাজের গভীর ভালোবাসার কথা উঠে এসেছে ‘ইকবালনামা-ই-জাহাঙ্গীরি’ গ্রন্থেও। এ বইয়ে মোতমিদ খাঁ লিখেছেন, ‘অন্যান্য স্ত্রীদের সাথে তার সম্পর্ক কেবল কাগজে-কলমে বিয়ে হিসেবেই ছিল। মমতাজ মহলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা, আবেগের গভীরতা, এবং তার প্রতি শাহ জাহানের মনোযোগ অন্য সব স্ত্রীদের চেয়ে অনেক বেশি ছিল।’

প্রথম জীবনে শাহ জাহান যখন পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন, সেই সময় তার সঙ্গী ছিলেন মমতাজ। অর্থাৎ সম্রাটের সবচেয়ে কঠিন দিনগুলোর সঙ্গী ছিলেন তিনি। সম্রাজ্ঞী হওয়ার মাত্র তিন বছরের মাথায় মারা যান মমতাজ।

অথচ সবচেয়ে কম সময় সম্রাজ্ঞী থেকে, কোনো অসাধারণ কর্ম না করেও মমতাজই বনে গেলেন সবচেয়ে বিখ্যাত মোগল রমণী। তিনি অমর হয়ে রইলেন স্বামীর অনিন্দ্য সুন্দর কীর্তি তাজমহলের মাধ্যমে।
মমতাজের মৃত্যুর পর দারুণ আঘাত পান শাহ জাহান। সাম্রাজ্য শাসনে তার মনোযোগ অনেকটাই কমে আসে। এ সময় তিনি হয়ে ওঠেন উদাসীন এবং পুত্রস্নেহে অন্ধ। রত্নপাথরের ওপর বাড়তে থাকে দুর্বলতা। মনোযোগ দিলেন স্ত্রীর জন্য সমাধিসৌধ গড়ায়। মৃত্যুর আগে মমতাজই স্বামীকে তার জন্য একটি সমাধিসৌধ বানানোর অনুরোধ জানিয়েছিলেন।

১৬৩২ সালে আগ্রায়, যমুনার দক্ষিণ তীরে, ১৭ হেক্টর জমির ওপর শুরু হয় মমতাজের জন্য সৌধ বানানোর কাজ। যা পরিচিত তাজমহল নামে। তাজমহলের ভেতরে আছে একটি মসজিদ, মকবরা, একটি পান্থশালা ও বাগান। ১৬৪৩ সালে প্রাথমিকভাবে তাজমহলের নির্মাণ সম্পন্ন হয়। তবে এরপরও চলতে থাকে সৌন্দর্যবর্ধন ও সজ্জার কাজ।

অবশেষে ১৬৫৩ সালে সম্পূর্ণরূপে তৈরি হয় তাজমহল। ওই আমলের হিসাবে তাজমহল তৈরি করতে ব্যয় হয়েছিল ৩২ মিলিয়ন রুপি। বর্তমান মূল্যমানে এই টাকা ৫৩ বিলিয়ন রুপির সমান।

পৃথিবীর ছায়াপথে রাক্ষুসে ব্ল্যাক হোলের প্রথম ছবি তুললেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা

তাজমহলের মূল আকর্ষণ মর্মর পাথরে মোড়ানো সমাধিসৌধটি, যেখানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন শাহ জাহানের প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজ মহল। ভুবন ভোলানো এই তাজ দিনে এক রূপে ধরা দেয়, রাতে অন্য রূপে। প্রায় ২০ হাজার শিল্পী ও কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল এই অপূর্ব স্থাপত্য নির্মাণে।

আওরঙ্গজেব: আরেক ভ্রাতৃঘাতক

মমতাজের মৃত্যুর পর শাহ জাহানের সমস্ত স্নেহ গিয়ে পড়ে মেয়ে জাহানারা ও জ্যেষ্ঠ পুত্র দারা শুকোর ওপর। দারাশুকোর প্রতি শাহ জাহানের অন্ধস্নেহের কারণে জ্বলে ওঠে আরেক গৃহযুদ্ধের আগুন। সিংহাসন দখলের জন্য উঠেপড়ে লাগেন শাহ জাহানের তৃতীয় পুত্র আওরঙ্গজেব।

আওরঙ্গজেব ছিলেন ভীষণ একগুঁয়ে, সাহসী ও ধার্মিক। আর ভাই দারা শুকোর সঙ্গে তার বিবাদের অন্যতম কারণই ছিল ধর্ম।

যৌবন থেকেই তিনি নিজের সমরকুশলতার প্রমাণ দিতে থাকেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও দারা শুকোর দিকেই ছিল শাহ জাহানের পক্ষপাত।

দারার আগ্রহ ছিল বইপত্র, জ্ঞান, দর্শন, ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার দিকে। একসময় তিনি ঝুঁকে পড়েন সুফিবাদের দিকে।

এই ফাঁকেই সিংহাসন দখলের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে থাকেন আওরঙ্গজেব। সুকৌশলে দরবারের আমীরদের মন জয় করে নেন। অন্যদিকে আধ্যাত্মবাদের জন্য দারার ওপর খেপে ওঠে আমীররা।

এরই মাঝে ১৬৫৭ সালের সেপ্টেম্বরে শাহ জাহান অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন থেকেই সিংহাসন দখলের জন্য সক্রিয় লড়াই শুরু হয় তার সন্তানদের মাঝে। ওই সময় শাহ জাহান দীর্ঘদিন ঘরে আটকা থাকায় গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে সম্রাট মারা গেছেন। গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে দারা শুকো বিষ খাইয়ে শাহ জাহানকে হত্যা করেছেন।

এই অবস্থায় বাংলায় অবস্থানরত শাহ জাহানের আরেক পুত্র শাহ সুজা নিজেকে সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করেন। কিন্তু শাহ জাহান নভেম্বরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। শাহ সুজাকে আটক করার জন্য তিনি সেনা পাঠান। এছাড়া ৫ ডিসেম্বর সম্রাটের আরেক ছেলে মুরাদ গুজরাটে বসে নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করেন।

অন্যদিকে আওরঙ্গজেব ভাইদের মতো নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করলেন না। বরং তিনি আরেক ভাই মুরাদকে সঙ্গে নিয়ে পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।

বিদ্রোহী ভাইদের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য পিতার পক্ষ থেকে সৈন্য নিয়ে এগোলেন দারা শুকো। কিন্তু সেই যুদ্ধে দারা হেরে যান। পরাজিত হয়ে তিনি পালান। আর আওরঙ্গজেব পিতাকে অবরুদ্ধ করেন। শেষে যমুনার পানি সরবরাহ বন্ধ করে দিয়ে তিনি দুর্গে পানি সঙ্কট সৃষ্টি করেন।

শেষতক শাহ জাহানকে কয়েদ করেন আওরঙ্গজেবের ছেলে মুহম্মদ। পলাতক দারাও ধরা পড়েন। দারাকে একটি নোংরা দুর্গন্ধময় হাতিতে চড়িয়ে দিল্লির পথে ঘোরানো হয়। তারপর বসানো হয় তার ‘বিচার’। ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে।

আজ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬১তম জন্মদিন | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন

১৬৫৯ সালের আগস্টের শেষ দিকে প্রহসনের বিচার শেষে দারার শিরশ্ছেদ করা হয় আওরঙ্গজেবের আদেশে। নিষ্ঠুরতার এখানেই শেষ নয়—হত্যার পর দারার শরীর টুকরো করে বস্তায় পুরে সেই বস্তা হাতির পিঠে চাপিয়ে ফের দিল্লিতে ঘোরানো হয়। আর দারা শুকোর কর্তিত মস্তকটি আওরঙ্গজেব পাঠিয়ে দেন তার বন্দি পিতার কাছে। আরেক ভাই মুরাদকে তিন বছর বন্দি করে রাখার পর হত্যা করেন আওরঙ্গজেব। আর শাহ সুজাকে বিতাড়িত করেন রাজ্যের সীমানা থেকে।

১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দে ৭৪ বছর বয়সে গৃহবন্দি থাকা অবস্থাতেই মারা যান শাহ জাহান। মৃত্যুর পর একটি নৌকায় করে তার মরদেহ তাজমহলে নিয়ে তাকে দাফন করা হয়।

এরপর আওরঙ্গজেব মোটামুটি নির্বিঘ্নেই রাজ্য শাসন করেন। কিন্তু তার সময়কাল থেকেই দুর্বল হতে শুরু করে মোগল সাম্রাজ্যের ভিত। একদিকে মারাঠাদের উত্থান হতে থাকে, অন্যদিকে ভারতবর্ষে শক্তিশালী হতে থাকে ইংরেজরা।

মোগল বংশে নিজেদের মধ্যে ক্ষমতার জন্য যে হানাহানি শুরু হয়, তা চলমান থাকে আওরঙ্গজেবের শাসনকালেও। মোগল সাম্রাজ্যের ভিত দুর্বল হওয়ার এটিও অন্যতম কারণ বলে মনে করা হয়। সিংহাসনের দখল নেওয়ার জন্য আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধেও বিদ্রোহ করে তার ছেলে কাম বখশ।

১৭০৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন আওরঙ্গজেব। তার মাধ্যমেই ইতি ঘটে ভারতবর্ষের ইতিহাসের অন্যতম সমৃদ্ধ রাজবংশের সোনালি অধ্যায়ের। এর পর মোগল শাসন ভেঙে পড়ে। যদিও পরের দেড়শ বছর ধুঁকে ধুঁকে টিকে ছিল এ সাম্রাজ্য। ভারতবর্ষে মোগল রাজবংশের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে বন্দি করে রেঙ্গুনে নির্বাসনে পাঠানোর মাধ্যমে।

তথ্যসূত্র:
মোগলনামা ১ম খণ্ড—মাহমুদুর রহমান
The Mughal World—Abraham Eraly
Emperors of the Peacock Throne—Abraham Eraly
Aurangzeb: The man and The Myth—Audrey Truschke
বিবিসি

Leave a Reply Cancel reply