সাফ ফুটবলের ফাইনাল খেলা ৬ জনই এক প্রতিষ্ঠান কলসিন্দুর স্কুলের -ময়মনসিংহের ধোবাউড়ার

সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশেরা মেয়েরা দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে সেরা হয়েছে। এই জয় শুধু আমরা না, দেশের আপামর জনতা গর্বিত। এই মেয়েরা জয়ের ধারা অব্যাহত রেখে একদিন বিশ্বকাপ জয় করে আনবে।
নেপালকে ৩-১ গোলে হারিয়ে নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে শিরোপা জিতেছেন মেয়েরা। ফাইনাল খেলায় ১১ জনের ৬ জনই ছিল ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার কলসিন্দুর স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষার্থী। তবে, ওই দলে খেলেছেন মোট ৮ জন।

এই কথাগুলো বলছিলেন ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার কলসিন্দুর স্কুল এন্ড কলেজের সহকারী অধ্যাপক ও কলসিন্দুর নারী ফুটবল টিমের ম্যানেজার মালা রানী সরকার। প্রথমবারের মতো সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জিতে দক্ষিণ এশিয়ায় ফুটবলে সেরা হয়েছেন বাংলাদেশ মেয়েরা। এই মেয়েরাই একদিন ফুটবল বিশ্বকাপ জিতবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে কলসিন্দুর স্কুল এন্ড কলেজ থেকে দলে খেলেছেন ৮ জন। এর মধ্যে মার্জিয়া, সাজিদা খাতুন, শিউলি আজিম, মারিয়া মান্ডা, শামসুন্নাহার সিনিয়র ও শামসুন্নাহার জুনিয়র মোট ৬ জন নেপালের বিপক্ষে ফাইনাল খেলায় অংশ নিয়েছে।
সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ী বাংলাদেশের নারী দলের ফুটবলার মার্জিয়ার বাবা আব্দুল মোতালেব বলেন, আমার মেয়ে শুরুতে এলাকায় যখন ফুটবল খেলত, তখন অনেকে বাঁকা চোখে দেখত। বলত মেয়েদের ফুটবল খেলতে নেই। এখন মেয়ের সাফল্যে এলাকার ওই লোকজনই সম্মান দিয়ে কথা বলেছে। মার্জিয়াসহ সব নারী ফুটবলারের জন্য দোয়া রইল।
জয়ে উচ্ছ্বসিত ফুটবল তারকা সানজিদা আক্তারের বাবা লিয়াকত আলী। জয়ের প্রতিক্রিয়া জানতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন তিনি। তিনি বলেন, আমার আনন্দের শেষ নেই আজ। বাবা হিসেবে আমি গর্বিত। দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে মেয়েগুলো। এই আনন্দ প্রকাশের ভাষা জানা নেই।
একই গ্রামের ফুটবল তারকা শামসুন্নাহার জুনিয়রের বাবা নেকবর আলী বলেন, সকাল থেকেই আমরা পরিবারের সদস্যসহ কলসিন্দুরের ফুটবল ভক্তরা শামসুন্নাহার জুনিয়রসহ সব খেলোয়াড়ের জন্য দোয়া করেছি। যোগ্যতার প্রমাণ রেখে বাংলাদেশের মেয়েরা সাফ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এই জয়ে গ্রামের সবাই আনন্দিত।
একই গ্রামের মারিয়া মান্ডার মা এনোতা মান্ডা বলেন, চ্যাম্পিয়ন হয়ে মেয়েগুলো বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে। ভবিষ্যতে মারিয়াসহ ফুটবল দলের এসব খেলোয়াড় আরও বড় জয় বাংলাদেশের জন্য এনে দেবে-এটাই প্রত্যাশা।
এসব ফুটবল তারকার স্থানীয় কোচ জুয়েল মিয়া বলেন, কলসিন্দুরের অগ্রযাত্রাকে ধরে রাখতে ক্ষুদে ফুটবলারদের নিয়মিত অনুশীলন চলছে। আজকের এই জয় নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের উৎসাহ জোগাবে।
১১ বছর আগে অপ্রতিরোধ্য এই ফুটবল কন্যাদের শুরুটা ২০১১ সালে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব ফুটবল টুর্নামেন্ট দিয়ে। জেলার সীমান্তবর্তী এলাকার গারো পাহাড়ের পাদদেশ থেকে ধোবাউড়া উপজেলার কলসিন্দুরসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রাম থেকে উঠে আসে একদল কিশোরী ফুটবলার। যাদের পায়ের জাদুতে ধুঁকতে থাকা নারী ফুটবল ফিরে পায় আলো। প্রথম দিকে যদিও এলাকার কিছু মানুষ তাদের ভিন্ন চোখে দেখতো, এখন আর সেই অবস্থা নেই।

৮ কন্যাকে বরণের অপেক্ষায় কলসিন্দুর

মেয়েদের বিশাল সাফল্যে ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার সীমান্তবর্তী কলসিন্দুর গ্রামের আনন্দের ঢেউ আশপাশের গ্রামগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে। চলছে বিশাল সংবর্ধনার আয়োজন।

নারী সাফ চ্যাম্পিয়ন দলের ৮ জনই গারো পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই কলসিন্দুর গ্রামের। তারা হলেন, সানজিদা আক্তার, মারিয়া মান্ডা, তহুরা আক্তার, শামসুন্নাহার (সিনিয়র), শামসুন্নাহার (জুনিয়র), শিউলি আজিম, সাজেদা আক্তার ও মার্জিয়া আক্তার। এই ৮ জন ছাড়াও আরও অনেক কিশোরী ফুটবলার উঠে এসেছে এ গ্রাম থেকে।

গত প্রায় এক দশক ধরে দেশের নারী ফুটবল মাতাচ্ছে অজপাড়া গাঁ কলসিন্দুর থেকে উঠে আসা একদল কিশোরী ফুটবলার। তাদের পায়ের জাদুতে দেশের ধুঁকতে থাকা ফুটবলে ফিরেছে আশার আলো। দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে তারা, লাল সবুজের পতাকাকে বিশ্বের বুকে তুলে ধরেছে। একইসঙ্গে পরিচিতি এনে দিয়েছে ছায়া সুনিবিড় কলসিন্দুর গ্রামকে।

উচ্ছ্বসিত এলাকাবাসী এখন তাদের সোনার মেয়েদের বরণ করে নেওয়ার প্রহর গুনছেন। তারা জানান, সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে জয় পাওয়ার পর থেকেই কলসিন্দুর তথা ধোবাউড়া উপজেলাসহ গোটা ময়মনসিংহ জেলায় আনন্দের বন্যা বইছে।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন খাঁন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ফুটবল কন্যাদের জয়ে কলসিন্দুরে ঘরে ঘরে ঈদের আনন্দ চলছে।’

তিনি জানান, উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ ও স্থানীয়রা মিলে মেয়েদের জন্য একটি বিশাল সংবর্ধনার আয়োজন করছেন।

চেয়ারম্যান বলেন, ‘এই অদম্য মেয়েরা সবাই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। আমরা তাদের নিয়ে ভীষণ গর্বিত।’

জয়ে উচ্ছ্বসিত ফুটবল তারকা সানজিদার বাবা লিয়াকত আলী ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এলাকাবাসীর মতো আমার গর্বও প্রকাশ করার মতো নয়। এটা আমাদের জীবনের সেরা আনন্দ।’

মেয়েদের স্থানীয় কোচ জুয়েল মিয়া ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘কলসিন্দুরের মেয়েদের এই সাফল্য আমাদের উৎসাহ আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। মেয়েদের অগ্রযাত্রাকে ধরে রাখতে ক্ষুদে ফুটবলারদের নিয়মিত অনুশীলন চলছে।’

পাহাড়ি গ্রামের যমজ বোনই এখন বাংলাদেশের আশার প্রদীপ

কলসিন্দুর নারী ফুটবল টিমের ম্যানেজার অধ্যাপক মালা রানী সরকার ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘জাতীয় নারী ফুটবল দলে কলসিন্দুরের মেয়েরা খেলছে, এটা অত্যন্ত গর্বের। আশাকরি আগামী দিনে দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে তারা আরও ভালো খেলা উপহার দেবে। নারী ফুটবলের এই উত্থান খুবই আশাব্যঞ্জক।’

তিনি আরও বলেন, ‘২০১১ সালে বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ দিয়ে ফুটবল শুরু করে কলসিন্দুরসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মেয়েরা। আজ এই কিশোরী ফুটবলাররা বিশ্বজয়ের দ্বারপ্রান্তে।’

দেশের হয়ে বিভিন্ন টুর্নামেন্ট জিতেছেন অদম্য এই কিশোরীরা। বদৌলতে সরকারিকরণ হয়েছে তাদের কলসিন্দুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবর্ধনাসহ আর্থিক অনুদান দিয়েছেন। অদম্য এই কিশোরীদের গল্প উচ্চ মাধ্যমিক শাখার একাদশ শ্রেণির পাঠ্য বইয়ে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে ‘দ্য আনবিটেন গার্লস’ (অপরাজিত মেয়েরা) হিসেবে।

মেয়েরা ফুটবল খেলবে, একসময় গ্রামবাংলায় এটা ছিল অসম্ভব। এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছে কলসিন্দুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিনতী রাণী শীল ও সহকারী শিক্ষক মফিজ উদ্দিন। বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ টুর্নামেন্টে ২০১৩, ২০১৪, এবং ২০১৫ সালে টানা চ্যাম্পিয়ন হয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে ক্ষুদে মেয়েরা। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) পুলক কান্তি চক্রবর্তী, অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) মো. আনোয়ার হোসেন আজ বুধবার বিকেলে কলসিন্দুর স্কুল অ্যান্ড কলেজে অদম্য মেয়েদের পরিবারকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান।

সেময় সবাইকে মিষ্টিমুখ করানো হয় বলে জানান ধোবাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফৌজিয়া নাজনীন।

কলসিন্দুরের ৮ ফুটবলারের পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা করে পুরস্কার

কলসিন্দুর গ্রামের সাফজয়ী ৮ ফুটবলারের প্রত্যেকের পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা করে পুরস্কার দিয়েছে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসন।

আজ বুধবার বিকেলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) পুলক কান্তি চক্রবর্তী ও অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) মো. আনোয়ার হোসেন কলসিন্দুর গ্রামে যান।

প্রথমে তারা ফুটবলার সানজিদার বাড়িতে গিয়ে তার মা-বাবার হাতে পুরস্কারের অর্থ তুলে দেন।

প্রিন্স অব কলকাতা সৌরভ গাঙ্গুলির জীবনী | Sourav Ganguly Biography in Bengali | কেমন ছিল ক্রিকেটের দাদার জীবন?

এরপর কলসিন্দুর স্কুল অ্যান্ড কলেজে বাকি ৭ ফুটবলারের পরিবারের সদস্যদের হাতে পুরস্কারের অর্থ তুলে দেওয়া হয়।

ধোবাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফৌজিয়া নাজনীন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘কলসিন্দুর স্কুল অ্যান্ড কলেজে অদম্য মেয়েদের পরিবারকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি উপস্থিত সবাইকে মিষ্টিমুখ করানো হয়েছে।’

মেয়েদের বিশাল সাফল্যে ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার সীমান্তবর্তী কলসিন্দুর গ্রামের আনন্দের ঢেউ আশপাশের গ্রামগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে। চলছে বিশাল সংবর্ধনার আয়োজন।

নারী সাফ চ্যাম্পিয়ন দলের ৮ জনই গারো পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই কলসিন্দুর গ্রামের। তারা হলেন, সানজিদা আক্তার, মারিয়া মান্ডা, তহুরা আক্তার, শামসুন্নাহার (সিনিয়র), শামসুন্নাহার (জুনিয়র), শিউলি আজিম, সাজেদা আক্তার ও মার্জিয়া আক্তার। এই ৮ জন ছাড়াও আরও অনেক কিশোরী ফুটবলার উঠে এসেছে এ গ্রাম থেকে।

গত প্রায় এক দশক ধরে দেশের নারী ফুটবল মাতাচ্ছে অজপাড়া গাঁ কলসিন্দুর থেকে উঠে আসা একদল কিশোরী ফুটবলার। তাদের পায়ের জাদুতে দেশের ধুঁকতে থাকা ফুটবলে ফিরেছে আশার আলো। দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে তারা, লাল সবুজের পতাকাকে বিশ্বের বুকে তুলে ধরেছে। একইসঙ্গে পরিচিতি এনে দিয়েছে ছায়া সুনিবিড় কলসিন্দুর গ্রামকে।

সাফ ফুটবলের ফাইনাল খেলা ৬ জনই কলসিন্দুর ,নারী ফুটবলের আতুরঘর কলসিন্দুরে আনন্দের বন্যা,স্কুলের,নারী ফুটবলার তৈরির ‘কারখানা’ কলসিন্দুর বিদ্যালয়,৮ কন্যাকে বরণের অপেক্ষায় কলসিন্দুর

Leave a Reply Cancel reply