Deprecated: Function WP_Dependencies->add_data() was called with an argument that is deprecated since version 6.9.0! IE conditional comments are ignored by all supported browsers. in /home/amadersa/public_html/wp-includes/functions.php on line 6131
সার্কাস ও সুন্দরী ‌সার্কাসের দলে বাঘের সঙ্গে খেলা দেখানো প্রথম ভারতীয় নারী।

সার্কাস ও সুন্দরী ‌ সার্কাসের দলে বাঘের সঙ্গে খেলা দেখানো প্রথম ভারতীয় নারী।

সার্কাস ও সুন্দরী ‌
সার্কাসের দলে বাঘের সঙ্গে খেলা দেখানো প্রথম ভারতীয় নারী। বাঙালি মেয়ে মাত্রই ঘোমটা টানা কলাবউ….এ অপবাদ এক লহমায় দূর করে দিয়েছেন তিনি। খাঁচার ভেতর ঢুকে সুশীলা বাঘকে আদর করতেন, চুমু খেতেন। তাদের নিজের কথামতো দাঁড় করাতেন, বসাতেন, গর্জন করাতেন। এমনকি তিনি তাদের সঙ্গে বাহুযুদ্ধও করতেন। তাদের চোয়াল টেনে ধরে দর্শকদের দেখাতেন। সবশেষে তাদের ওপর হেলান দিয়ে দাঁড়াতেন ছবি তোলার জন্য। হাততালিতে কেঁপে উঠতো সার্কাসের বিশাল তাঁবু!..,…….

আমাদের ছোটবেলায় শীতকাল এলেই বল খেলার মাঠে পড়তো সার্কাসের তাঁবু। বিশাল জায়গা নিয়ে একটা বড়ো তাঁবুর দুপাশে আরো কটা ছোট তাঁবু, আর সবায়ের মাথায় উড়তো রঙিন পতাকা। মাঝে মাঝেই সেখান থেকে ভেসে আসতো বাঘ কিংবা হাতির ডাক। কমলা সার্কাস, জেমিনি সার্কাস ছিল সে আমলের বিখ্যাত সার্কাস দল। মূলত দক্ষিণ ভারতীযরাই ছিল এসব দলের মালিক বা খেলোয়াড়।
ইতিহাস বলে ভারতে পেশাদারী ভাবে সার্কাসের আত্মপ্রকাশ এক বাঙালির হাত ধরে। ১৮৮৩ সালে নবগোপাল মিত্র ও তার জামাই প্রতিষ্ঠা করেন দি গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্কাস। তবে সেখানে শুধু ঘোড়া আর ট্রাপিজের খেলা দেখানো হতো। সে অর্থে প্রকৃত সার্কাস বলতে যা বোঝায় তার সূচনা বোসের গ্রেট বেঙ্গল সার্কাসের হাত ধরে। এই সার্কাস কম্পানির মালিক ছিলেন ছোট জাগুলিয়ার মতিলাল বসু। তাঁর স্ত্রী রাজবালার হাত ধরেই প্রথম বাঙালি নারীর সার্কাসের জগতে পদার্পণ। রাজবালা ছিলেন মূলত ট্রাপিজ শিল্পী। ট্রাপিজ ও ব্যালেন্সের খেলা দেখিয়েই তিনি সুনাম অর্জন করেছিলেন। কিন্তু তাঁর সার্কাস জীবন ছিল খুবই অল্প সময়ের। কন্যা জন্মের পর খেলা থেকে তিনি সরে যান। তার কিছুদিনের মধ্যেই মতিলালেরও মৃত্যু ঘটে । এরপর গ্রেট বেঙ্গল সার্কাসের কর্ণধার হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে তাঁর ছোট ভাই প্রিয়নাথ বসুর। তিনি ১৯০৯ সালে গ্রেট বেঙ্গল ভেঙে দিয়ে গড়ে তোলেন প্রফেসর বোসেস গ্র্যান্ড সার্কাস।
দাদার সঙ্গে দল নিয়ে ঘোরার সময় সার্কাসের খেলা দেখে খুশি হয়ে ১৮৯৬ সালে রেওয়া-এর মহারাজা তাদের উপহার দেন একজোড়া বাঘ। নাম দেওয়া হয় লক্ষ্মী ও নারায়ণ। অচিরেই সার্কাসের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠল বাঘের খেলা। সার্কাসের অন্যতম খেলোয়াড় ছিলেন বাদলচাঁদ। বাঘেরা ছিল তাঁর নিতান্ত পোষ মানা। খাঁচার ভেতর ঢুকে রীতিমতো বাঘের সাথে কুস্তি জুড়ে দিতেন তিনি। এমনকি খেলার শেষে সম্মিলিত দর্শকের চিত্কারকে উপেক্ষা করে বাঘের মুখে ঢুকিয়ে দিতেন নিজের মাথা!
তবে এই সার্কাস দলের অন্যতম আকর্ষণ ছিল সুশীলা সুন্দরী। সার্কাসের দলে বাঘের সঙ্গে খেলা দেখানো প্রথম ভারতীয় নারী। বাঙালি মেয়ে মাত্রই ঘোমটা টানা কলাবউ….এ অপবাদ দূর করেন তিনি। জন্ম ১৮৭৯ সালে পুরানো কলকাতার নিষিদ্ধ পল্লীর রাম বাগানে। দুই বোনই তারা পেটের দায়ে এসেছিল সার্কাসে। একসময় তার নাম বিখ্যাত হয়ে ওঠে গ্রেট বেঙ্গল সার্কাসের সুশীলা সুন্দরী রূপে। তবে এটা তার আসল নাম কিনা সে নিয়েও সংশয় আছে।
ছোটোবেলা থেকেই সুশীলার নানান রকম ব্যায়ামের দিকে প্রবল আগ্রহ ছিল। কলকাতার সিমলা অঞ্চলে প্রফেসর প্রিয়নাথ বোস ব্যায়ামের আখড়া খুললে সুশীলা ও তাঁর বোন কুমুদিনী সেখানে যোগ দেন এবং পরে সার্কাসে চলে আসে। শীঘ্রই অন্যান্য খেলার সঙ্গে সে বাঘের খেলাও দেখাতে শুরু করে।
এর আগে সার্কাসে খেলা দেখানোর সময় বাঘগুলোকে চেন দিয়ে বেঁধে তবে খেলা দেখানো হতো। গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্কাসের শ্যামাকান্ত বন্দ্যোপাধায় গোপাল নামের বাঘের সঙ্গে কুস্তি লড়তেন। কিন্তু এই খেলায় বাঘের গলায় চেন পরানো থাকত এবং সেই চেনের শেষপ্রান্ত থাকত অন্য একজনের হাতে। বিপদ বুঝলেই চেন টেনে বাঘকে সরিয়ে দেওয়া হতো।
সে অর্থে বোসেদের সার্কাসে বাঘ খোলা রাখা হতো। গ্র্যান্ড সার্কাসে বাদল চাঁদের পর যিনি এই খেলা দেখাতেন তিনি আর কেউ নন, এই বাঙালি মেয়ে সুশীলা। তার খেলা দেখাবার সময় বাঘেরা থাকত মুক্ত। খাঁচার ভেতর ঢুকে সুশীলা বাঘকে আদর করতেন, চুমু খেতেন। তাদের নিজের কথামতো দাঁড় করাতেন, বসাতেন, গর্জন করাতেন। এমনকি তিনি তাদের সঙ্গে বাহুযুদ্ধও করতেন। তাদের চোয়াল টেনে ধরে দর্শকদের দেখাতেন। সবশেষে তাদের ওপর হেলান দিয়ে দাঁড়াতেন ছবি তোলার জন্য। হাততালিতে কেঁপে উঠতো সার্কাসের বিশাল তাঁবু!
আরো একটি খেলা দেখানোর জন্য তার নামডাক ছিল……জীবন্ত সমাধি। সার্কাসের রিংয়ের এক কোণে সুশীলাকে গর্ত করে পুঁতে দেওয়ার পর সেই কবরের ওপর বেশ কিছু দর্শক ঝাঁপাঝাঁপি লাফালাফি করে দেখতেন, ঠিকমতো কবর দেওয়া হয়েছে কি-না। তার পর সেখানে ঘোড়ার খেলা দেখানো হতো। শো শেষ হবার ঠিক আগে সুশীলা গর্তের মধ্যে থেকে হাসতে হাসতে স্টেজের ওপর উঠে আসতেন।
জানা যায় একবার সার্কাসে শো চলাকালীন সুশীলাকে কবর দেবার পর হঠাৎ ঝড় ও মুষলধারে বৃষ্টি নামে। সার্কাসের শো বন্ধ করে দিতে হয়। বাড়ি ফিরে প্রফেসর বোসের মনে পড়ে সুশীলাকে কবর থেকে তোলা হয়নি। তিনি দ্রুত ফিরে যান মাঠে। দেখেন সেই কবর থেকে সুশীলা গায়ের জোরে উঠে এসেছেন মাটি ফুঁড়ে।
খ্যাতির মধ্য গগনেই সুশীলাকে সার্কাস থেকে সরে যেতে হয় এক দুর্ঘটনার জেরে। সুশীলা যে বাঘ দু’টিকে নিয়ে খেলা দেখাতেন তাদের একটি মারা গেলে নতুন এক বাঘ ফরচুনকে নিয়ে খেলা দেখাতে যান তিনি। এই বাঘটি তখনো পুরোপুরি ট্রেনিং পেয়ে ওঠেনি, তার ওপরে সেদিন তাকে আধপেটা করে রাখা হয়েছিল। সব খেলা শেষ করে সুশীলা যখন বাঘের গায়ে হেলান দিয়ে শুয়েছিলেন তখন হঠাৎ বাঘটি থাবা দিয়ে জোরে আঘাত করলে ভীষণভাবে আহত হন তিনি। অতি কষ্টে সুশীলার প্রাণ রক্ষা হলেও ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে আর রিংয়ে ফেরা সম্ভব হয়নি তাঁর।
১৯২৪ সালের মে মাসে সুশীলার মৃত্যু হয়।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের গেরোয় কবেই বন্ধ হয়ে গেছে বাঘ সিংহের খেলা, সার্কাস হারিয়েছে তার অতীতের জৌলুস। বর্তমান প্রজন্মের কাছে এসব আজ শুধুমাত্র ইতিহাস।
কলমে ✍🏻 স্বপন সেন
©ভালবাসি বাংলা
তথ্যঋণ: এইসময় পত্রিকা

Leave a Reply