একদিকে করোনা অন্যদিকে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেড়েই চলেছে। তাই এ সময় সুস্থ থাকাটা চ্যালেঞ্জের বিষয়। করোনার পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রতিরোধে তা সচেতন থাকতে হবে। অন্যদিকে ডেঙ্গু হলে শরীর সুস্থ রাখতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পাশাপাশি পুষ্টিকর খাবার খাওয়া জরুরি। কারণ ডেঙ্গুতে শরীরের প্লাটিলেট কমে যেত শুরু করে। এ ছাড়াও শারীরিক বিভিন্ন সমস্যা বাড়তে পারে। তাই ডেঙ্গু জ্বর হলে পুষ্টিকর খাবারের মাধ্যমে শরীরে পুষ্টি গ্রহণ আরও বাড়াতে হবে। পুষ্টিবিদদের মতে, ডেঙ্গু হলে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার দিকে খেয়াল রাখা জরুরি। জ্বর হলে অনেকেই খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দেন। এর থেকে হতে পারে পানিশূন্যতা। পাশাপাশি কমে যেতে পারে প্লাটিলেট সংখ্যা। তাই বাড়িতে কারও ডেঙ্গু জ্বর অবশ্যই কয়েকটি খাবার খাওয়ানো জরুরি।
জেনে নিন কোন খাবারগুলো খাওয়াবেন ডেঙ্গু রোগীকে-
>> ডালিমে থাকে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ও মিনারেল। এ সময় ডালিম খেলে বাড়বে প্লেটলেটের সংখ্যা। এই উপকারী ফলটি খেলে ক্লান্তি ও অবসাদ অনুভূতিও দূর হবে।
> শারীরিক সুস্থতায় ডাবের পানি অনেক উপকারী। ডেঙ্গু জ্বর হলে শরীরে তরল পদার্থের শূন্যতা থেকে সৃষ্টি হয় ডিহাইড্রেশন। তাই এ সময় বেশি করে ডাবের পানি পান করুন। এতে থাকে ইলেক্ট্রোলাইটসের মতো প্রয়োজনীয় পুষ্টি।
> কমলা বা মালটার রসে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। এ দুটি উপাদান ডেঙ্গু জ্বর নিয়ন্ত্রণে উপকার করে।
> কিউই ফলেও প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন পাওয়া যায়। সেই সঙ্গে এতে থাকে পটাশিয়াম। এ ফল খেলে ইলেক্ট্রোলাইট স্তর এবং উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে। সেইসঙ্গে কিউই খেলে শরীরে লোহিত রক্ত কণিকার মাত্রাও বৃদ্ধি পায়।
>> রান্নাঘরের একটি উপাদান হলো হলুদ। যা চিকিৎসায় যুগ যুগ ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
ডেঙ্গু জ্বর হলে এক গ্লাস দুধের সঙ্গে এক চিমটি হলুদ মিশিয়ে পান করুন। হলুদ দুধ খাওয়ার একাধিক স্বাস্থ্য উপকারিতা আছে।
>> মেথি সবার ঘরেই নিশ্চয়ই আছে! ডেঙ্গু হলে অতিরিক্ত মাত্রার জ্বর কমাতে সাহায্য করে এই উপাদানটি। তবে মেথি গ্রহণ করার পূর্বে অবশ্যই চিকিৎসকের সঙ্গে পরমার্শ করে নিতে হবে।
ব্রোকোলি হলো ভিটামিন কে’র একটি ভালো উত্স। অন্যদিকে ভিটামিন কে রক্তের প্লেটলেট বৃদ্ধি করতে সহায়তা করে। যদি কোনো ব্যক্তি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন; তাহলে অবশ্যই তাকে ব্রোকোলি খাওয়াতে হবে।
>> পালং শাকে থাকে প্রচুর পরিমাণে আইরন এবং ওমেগো-থ্রি ফ্যাটি এসিড।
শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকেও শক্তিশালী করেতে সহায়তা করে এই শাক। পালং শাক গ্রহণে ডেঙ্গু রোগীর প্লেটলেট দ্রুত বাড়বে।
> ডেঙ্গু হলে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার পাশাপাশি তৈলাক্ত ও ভাজাপোড়া খাবার পরিহার করুন। সেইসঙ্গে মসলাযুক্ত খাবারও এড়িয়ে চলতে হবে। এ ছাড়াও ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় খাবেন না। এসব খাবার শরীরের কোনো উপকারেই আসে না বরং ক্লান্তি ও অসুস্থতা বাড়িয়ে দেয়।
সারা দেশেই ডেঙ্গু রোগী বাড়ছে। করোনার পাশাপাশি ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় মানুষের মনে দেখা দিচ্ছে আতঙ্ক। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো প্লাটিলেট কমে যাওয়া। এ ছাড়া তীব্র মাথাব্যথা, মাংসপেশি ও চোখের পেছনে ব্যথা, শরীরে লালচে র্যাশ উঠতে পারে।
ডেঙ্গু ভাইরাসজনিত একটি রোগ, যা এডিস মশার মাধ্যমে সংক্রমিত হয়ে থাকে। এ ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে প্রথম মানবদেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় খাবার দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা বাঞ্ছনীয়। ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় খাবার হলো প্রোটিন ও আয়রনসমৃদ্ধ খাবার। মাছ, মুরগির মাংস, চর্বিহীন লাল মাংস (গরু, ছাগল), ডিম, দুধ ও দুগ্ধজাত খাদ্যে প্রোটিন বেশি থাকে।
এই খাবারগুলো রোগীর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। রক্তে প্লাটিলেটের সংখ্যা বাড়াতে আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের জুড়ি নেই। পালংশাক, সামুদ্রিক মাছ, কলিজা, মিষ্টিকুমড়া, ডালিম, মটরশুঁটি, ছোলা, মসুর ডাল, কচুশাক ইত্যাদিতে প্রচুর পরিমাণ আয়রণ রয়েছে, যা রোগীর শারীরিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতেও সাহায্য করে। এ ছাড়া রক্তক্ষরণ ঝুঁকি কমাতে ডেঙ্গু রোগীকে ভিটামিন কে জাতীয় খাবার, যেমন সবুজ শাকসবজি, বাঁধাকপি, ব্রকলি ইত্যাদি খাওয়াতে হবে।
এসব খাবারে দরকারি খনিজ উপাদান ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের পরিমাণও বেশি থাকে। তাই প্রতিদিন রোগীকে এই খাবারগুলো পরিমাণমতো খাওয়াতে হবে। ভিটামিন বি-১২–এর অন্যতম উৎস ডিম, দুধ, মাখন, পনির, কম চর্বিযুক্ত দই। ভিটামিন সি একটি কার্যকারী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা কোলাজেন উৎপাদনে সহায়তা করে এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। ভিটামিন সি জাতীয় খাবার রক্তে প্লাটিলেটের সংখ্যা স্বাভাবিক রাখতেও কার্যকর। কমলা, মাল্টা, আপেল, পেয়ারা, আমড়া, পেঁপে, আম, আনারস, আঙুর, জাম ইত্যাদি ফলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি আছে। ডেঙ্গু রোগীকে প্রতিদিন এই ফলগুলো পরিমিত পরিমাণে খাওয়াতে হবে। ডেঙ্গু রোগীদের পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে রোগীকে প্রতিদিন আড়াই থেকে তিন লিটার পানি পান করতে হবে।
পাশাপাশি শরীরে পানির পরিমাণ ঠিক রাখতে ডাবের পানি ও বিভিন্ন ধরনের ফলের রস উপকারী। এ ছাড়া নরম সেদ্ধ জাউ ভাত, খিচুড়ি, বিভিন্ন ধরনের স্যুপ খেতে দিতে হবে। প্রয়োজন বুঝে ডেঙ্গু রোগীকে ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশনও (ওআরসি) দেওয়া যেতে পারে। ডেঙ্গু জ্বরের রোগীদের কিছু খাবার এড়িয়ে চলতে হবে।
যেমন তৈলাক্ত ও ভাজা খাবার, প্রক্রিয়াজাত খাবার, স্যাচুরেটেড ফ্যাটযুক্ত খাবার, মসলাযুক্ত খাবার, আচার, চিনিযুক্ত খাবার, কাঁচা সবজি ইত্যাদি। এ ছাড়া উচ্চ আঁশযুক্ত খাবার, চা-কফি, কোকো, অন্যান্য ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় ইত্যাদিও এড়াতে হবে।
এডিস মশার জন্মস্থল
এডিস মশা শহরের আবদ্ধ জলাধার বা পানিতে বেশি বংশ বিস্তার করে। যেমনঃ টবের পানি, নারকেলের মালা, এসির নিচে জমে থাকা পানি, কমোডের পানি ইত্যাদি। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীকে কামড়ানোর মাধ্যমে এডিস মশকী প্রথমে জীবাণুবাহক হয় এবং তারপর তা অন্য কাউকে কামড়ালে লালার মাধ্যমে সেই ব্যক্তিও আক্রান্ত হয়। এভাবেই এর রোগ ছড়াতে থাকে আমাদের চারপাশে।
ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ
সাধারনত বছরের জুন-জুলাই মাস থেকে শুরু করে সেপ্টেম্বর- অক্টোবর মাসের শেষ পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা যায়। ডেঙ্গু জ্বরের নির্দিষ্ট উপসর্গ থাকে, কিন্তু সবারই যে সবসময় একই রকম উপসর্গ দেখা দিবে তা নয়। চলুন তবে দেখে নেই ডেঙ্গু জ্বরের পূর্ব ও বর্তমান লক্ষণসমূহ!
পূর্ব লক্ষণসমূহ
১. আকস্মিক জ্বর
২. প্রচন্ড মাথাব্যথা
৩. চোখ ব্যথা
৪. আলোতে অস্বস্তি
৫. কোমরে বা মেরুদন্ডে ব্যথা
৬. শরীরের হাড়ে হাড়ে ব্যথা
৭. অরুচি
৮. ক্ষুধামন্দা
৯. বমি বমি ভাব
১০. কখনো কখনো শরীরের ত্বকে লালচে র্যাশ দেখা দেয়া।
বর্তমান লক্ষণসমূহ
তবে সম্প্রতি যে ধরনের ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব আমাদের দেশে দেখা দিয়েছে তাতে বমি, পাতলা পায়খানা এবং পেট ব্যথা ও দেখা দিচ্ছে। ইদানিংকালের এই ধরনের ডেঙ্গুর বেশিরভাগই হচ্ছে হেমোরেজিক ধরনের। যাতে রোগীর নাক দিয়ে, বমির সাথে, এমনকি পায়খানার সাথেও রক্তক্ষরণ হতে পারে। ফলে রোগীর প্লাটিলেট দ্রুত কমা শুরু করে এবং ভয়াবহ পরিণতিতে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। তাই তীব্র জ্বর হওয়ার পরদিনই এখন রক্ত পরীক্ষা করানো জরুরি। অনেকের আবার তীব্র জ্বর হচ্ছে না। সাধারন জ্বরের মতই লক্ষণ থাকে। এর সাথে পেটে ব্যথা, হালকা ঠান্ডা জ্বর ও বমি হতে পারে। আবার বমি নাও হতে পারে। এছাড়াও শরীরের ভিতর পানি জমে প্রেশার লো হয়ে যেতে পারে।
ডেঙ্গু রোগীর খাদ্যাভাস
১) পানি ও তরল জাতীয় খাবার
যেহেতু এই অসুখে শরীরের তাপমাত্রা হঠাৎ করেই অনেক বেড়ে যায়, তাই এ সময় শরীরে প্রচুর পানি ও তরল জাতীয় খাবার প্রয়োজন। চিকিৎসকদের মতে একজন ডেঙ্গু রোগীর দৈনিক ৩ লিটার বা ১২ গ্লাস পানির প্রয়োজন। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অরুচির জন্য শরীরে পানির পরিমাণে যথেষ্ঠ ঘাটতি দেখা দেয়। তাই পানির পাশাপাশি বিভিন্ন ফলের যেমনঃ আম, মাল্টা, লেবু, বেদানা বা আনার, আপেল, আনারসের রস দেওয়া যেতে পারে।
২) শর্করা ও প্রোটিন সমৃদ্ধ খাদ্য
ক্ষুধামন্দা সত্বেও রোগীকে পর্যাপ্ত পরিমাণে শর্করা ও প্রোটিন সমৃদ্ধ খাদ্য যেমনঃ নরম ভাত, ডাল, ডিম, মাছ, মাংস খেতে হবে। তবে যেহেতু এ সময় অনেকের বদহজম বা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যাও দেখা দিতে পারে তাই তারা ডিমের কুসুমের অংশটি বাদ দিতে পারে।
৩) পাতলা ঝোল
কোনভাবেই এ সময় অতিরিক্ত তেল, মশলা দিয়ে রান্না করা কোন খাবার বা বাইরের কোন ফাস্ট ফুড জাতীয় খাবার খাওয়া যাবে না। মাছ বা মাংসের ঝোল না খেয়ে সিদ্ধ করে পাতলা ঝোল করে খেতে হবে।
৪) স্যুপ
বেশি মশলা দিয়ে রান্না করা গরু বা খাসির মাংসের চেয়ে ছোট মুরগীর সহজপাচ্য ঝোল বা স্যুপ বেশি উপকারী। কয়েক রকমের সবজি সিদ্ধ করে স্যুপ অথবা টমেটো স্যুপ, চিকেন স্যুপ, কর্ন স্যুপ খেলে অনেক সময় অরুচি কাটে আবার শরীরের পানির চাহিদাও পূরণ হয়।
এছাড়া নিয়মিত খাওয়া-দাওয়ার পাশাপাশি রোগীকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে।
রক্তের প্লাটিলেট বাড়াতে সাহায্য করে যেসব ফল ও সবজি
১. পেঁপে
এই সবজি প্লাটিলেট বাড়াতে সাহায্য করে। এমনকি পেঁপে পাতা থেঁতলে রস করে অনেক সময় দ্রুতই প্লাটিলেট বাড়ে। তবে গর্ভবতী ও শিশুদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা তা দিতে নিষেধ করেন। তাছাড়া এই বিষয়ে অনেক মত বিরোধ রয়েছে।
২. বেদানা
প্রতিদিন আনার বা বেদানার রস খেলে প্লাটিলেট দ্রুত বাড়ে।
৩. ব্রকোলি
ব্রকোলি এমন একটি বিদেশি সবজি যা রক্তের প্লাটিলেট বা অণুচক্রিকা বাড়ায়। তবে কখনোই বেশি মশলা দিয়ে রান্না না করে বরং সিদ্ধ করে খাওয়া বেশি ভালো।
একজন ডেঙ্গু রোগীর প্রতিদিনের খাদ্য তালিকা
সকালের খাবার
সকালে ( ৮/৯ টা)
পাউরুটির নরম অংশ – ২ টুকরা+ দুধ
অথবা
- পাউরুটির নরম অংশ – ২ টুকরা
- ডিম সিদ্ধ – ১ টা
- কলা- ১ টা
সকাল (১১-১১ঃ৩০) টা
বেদানার রস- ১ কাপ
আপেল- ছোট ১ টা
দুপুরের খাবার
- নরম ভাত- ১ কাপ
- ডাল- ১ কাপ
- সবজি ( সিদ্ধ করে অল্প তেল মশলা দিয়ে রান্না করা) – ১.৫ কাপ
- মাছ/ মাংস – ২ টুকরা ( ঝোল ছাড়া)
বিকেলের খাবার
সবজি ও চিকেন মিক্সড স্যুপ ( অল্প তেল-মশলা দিয়ে রান্না করা) -১ বাটি
রাতের খাবার
- নরম ভাত- ১ কাপ
- ডাল- ১ কাপ
- সবজি – ১ কাপ
- মাছ/ মাংস- ২ টুকরা ( ঝোল ছাড়া)
ডেঙ্গু প্রতিরোধে আমাদের সবার সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি। প্রত্যেকে নিজের ঘর আর আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখলে এডিস মশা বংশ বিস্তার করতে পারবে না। সবার সুস্থতা কামনা করে আজকে এখানেই শেষ করছি। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন!
সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস