বাঙ্গালী স্বাধীনতার শহীদ দীনেশ গুপ্ত | অমর শহীদ দীনেশচন্দ্র গুপ্ত

মাতৃভূমির অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান বিপ্লবী দীনেশ গুপ্তের আজ আত্মবলিদান দিবস স্মরণ করি সেই অসীম সাহসী সেই বীর বিপ্লবী কে , তার ফাঁসি হবার দিনে বয়স ছিল মাত্র ১৯ একটি অসাধারন প্রতিবেদন গনশক্তি পত্রিকা থেকে রাইটার্সে বারুদের গন্ধ দেবব্রত বিশ্বাস পরাধীনতার নাগপাশ থেকে দেশকে মুক্ত করার শপথ নিয়ে বিপ্লবের বীজ বুনেছিলেন একঝাঁক দেশপ্রেমিক।
১৯৩০সালে এক শীতের সকালে সেই শপথকে বাস্তব রূপ দিতেই তিন বাঙালী বিপ্লবী অসীম সাহসে ভর করে ঢুকে পড়েছিলেন রাইটার্স বিল্ডিংয়ে। গর্জে উঠেছিল তাঁদের বন্দুকের নল। লক্ষ্য ছিল সিম্পসন সাহেব। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামে সেই ত্রয়ীর অন্যতম ছিলেন দীনেশ গুপ্ত। তাঁদের লড়াই এখনও প্রেরণা জোগায় আমাদের। চলতি বছরটি এই অমর শহীদের জন্মশতবর্ষ। তাঁকে স্মরণ করেই লিখেছেন দেবব্রত বিশ্বাস। ভোরের আলো তখনও ফোটেনি।
বাঙ্গালী স্বাধীনতার শহীদ দীনেশ গুপ্ত
বয়স্ক রাতটা তারাদের হাত ধরে পুরানো বাসায় ফেরার তোড়জোড় করছে। কুয়াশায় ভেজা ফুটপাতে কৃষ্ণচূড়া ফুলের অলস শয্যা। ৭০নং পার্ক স্ট্রিট। বাড়ির দরজাটা নিঃশব্দে খুলে গেল। সুপ্ত শহরবাসীকে উদ্বিগ্ন না করে ধীর পায়ে বেরিয়ে এলেন বাদল গুপ্ত, দীনেশ গুপ্ত। কুড়ির কাছাকাছি বয়স। পরনে সামরিক সজ্জা। নিকুঞ্জ সেনের তত্ত্বাবধানে উঠে পড়লেন একটা ট্যাক্সিতে। ফাঁকা রাস্তায় ঝড়ের বেগে ছুটলো গাড়ি। খানিক বাদে পৌঁছলেন খিদিরপুর পাইপ‍ রোডের নির্দিষ্ট স্থানে। অন্যদিকে, মেটিয়াব্রুজের রাজেন গুহের বাড়ি থেকে পথে নামলেন বিনয় বসু। রসময় শূরের সঙ্গে চলে এলেন পাইপ রোডে। তারপর বিনয়, বাদল, দীনেশ একসঙ্গে শুরু করলেন সেই ঐতিহাসিক যাত্রা।
যা আজও শিহরণ জাগায় মনের অন্দরমহলে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উধাও ঠাণ্ডার আমেজ। সময় গড়াচ্ছে। রাইটার্স বিল্ডিংয়ের সামনে সেই পরিচিত ব্যস্ততা। গাড়ি-ঘোড়ার দুড়দাড় দৌড়। অজস্র মানুষের হাঁকডাক। লালমুখো সাহেবরা লালবাড়িটাতে ঢুকছেন বেরোচ্ছেন। প্রতি গেটে সিপাহীদের কড়া পাহারা। অপরিচিতদের দেখলেই হাজারো জিজ্ঞাসাবাদ। এগারোটা নাগাদ মহাকরণের সামনে এসে গাড়ি থেকে নেমে এলেন তিনজন। ধীরে সুস্থে এগিয়ে গেলেন। রাস্তা পেরিয়ে চলে এলেন পশ্চিম গেটের সামনে। সান্ত্রীরা কোনো প্রশ্ন করলো না।
তাদের সাহেবী পোশাক এবং চলন বলন দেখে কারো মনে কোনো সন্দেহ জাগেনি। মাথায় সুন্দর টুপি, গলায় ঝোলানো মাফলার। ইউরোপীয়দের মতো গটগট করে ঢুকে গেলেন। বিল্ডিংয়ে ঢোকামাত্রই তাঁদের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো। চোখের দৃষ্টিতে প্রতিশোধের আগুন। অলস ভঙ্গি নিমেষে উধাও। তড়িৎগতিতে সিঁড়ি পেরোতে লাগলেন। তাঁদের লক্ষ্য বড় বড় আমলাদের ঘরের দিকে। কারা বিভাগের ইন্সপেক্টর জেনারেল কর্নেল সিম্পসন এক মনে নিজের কাজ করছিলেন। ঘরে বসেছিলেন জ্ঞান গুহ। ঘূণাক্ষরেও টের পাননি কী ভীষণ বিপদ তাঁর সামনে।
কক্ষের ভিতরে এসে দাঁড়ালেন তিনজন। প্রত্যেকের হাতেই ঝকমকে রিভলভার। গগনভেদী আওয়াজ আর এক টুকরো লালাভ আলো ছিটকে বেরুলো ধাতব নল দিয়ে। ঢলে পড়লেন সিম্পসন। গুলি বুক ফুটো করে বাইরে বেরিয়ে গেছে। বারুদের গন্ধ মেখে রাইটার্সে শুরু হলো এক ঐতিহাসিক অভিযান। তিন বাঙালী যুবকের সেই সংগ্রাম আজও আমাদের অবাক করে। কতটা সাহসী দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলে এইরকম আক্রমণ শানানো যায় তা ভাবার বিষয়। পুলিসের তীক্ষ্ণ নজর এড়িয়ে রাইটার্সে ঢোকা এবং বেরোনোর পথ রুদ্ধ জেনেও হত্যাকাণ্ড ঘটানোর মানসিকতা দেখে উদ্বুদ্ধ হয় বিপ্লবীরা। দীনেশচন্দ্র গুপ্ত বা দীনেশ গুপ্তের জন্ম ১৯১১সালের ৬ই ডিসেম্বর। বাবা সতীশচন্দ্র গুপ্ত ছিলেন ডাক বিভাগের কর্মী।
পূর্ব বাংলার নেত্রকোণায় দীনেশের জন্ম। তাঁর বাবা সেই সময় চাকরিসূত্রে এখানে ছিলেন। চার ভাই ও চার বোনের মধ্যে দীনেশ ছিলেন তৃতীয় সন্তান। মা বিনোদিনী দেবী ও পরিজনরা তাঁকে ভালোবেসে ডাকতেন নসু নামে। বাবার বদলির সূত্রে দীনেশ চার বছর বয়সে চলে আসেন গৌরপুরে। সেখানে জমিদারের ঠাকুর দালানের পাঠশালায় প্রবেশ। ছাত্রসংখ্যা খুবই স্বল্প। নয় বছর বয়সে ঢাকা গ্যান্ডারিয়াতে দাদুর বাড়িতে থাকতে যান। সেখানে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে পড়তে শুরু করলেন। পাঠ্য বইয়ের বাইরেও প্রচুর পড়তেন।
বিশেষত ডিটেকটিভ গল্প। তাঁর বন্ধুস্থানীয় বিপ্লবী বঙ্গেশ্বর রায় বলেছেন— ‘চাল চলতিতে কথাবার্তায় স্কুল গণ্ডির বাইরে পড়াশোনায় দীনেশদা বয়সের মাপের চেয়ে আরও বড় ছিলেন। মনে পড়ে, পাড়ার সরকার বাড়ির মাঠে বিকাল-সন্ধ্যায় যখন খেলাধুলা বা বিশ্রাম করতাম দীনেশদাকে পাশের রাস্তা দিয়ে যেতে দেখলেই টেনে এনে বসাতাম গল্প বলার জন্য। পীড়াপীড়ি করলেই শুরু করতেন সেকালে বিখ্যাত ডিটেকটিভ উপন্যাসের মিঃ ব্ল্যাক ও মিঃ ব্যাটের কাহিনী। দীনেশদা’র বয়স তখন বারো, কিন্তু গল্প বলার ক্ষমতা ছিল অদ্ভুত।’
যে কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তাঁর ছিল অনিবার্য উপস্থিতি। বক্তৃতা করতেন সাবলীলভাবে। সমবয়সীদের যা কল্পনার অতীত। রবীন্দ্রনাথের কবিতার ভক্ত দীনেশের মন ছিল মমত্বপূর্ণ। তিনি সং‍ক্ষিপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘পুজোর একটি দিনে আমার বড় কষ্ট হতো। সেটা অষ্টমীর দিন। জমিদার বাড়ির প্রথামত একশ আটটা পাঁঠা সেদিন বলি দেওয়া হত। পাঁঠাগুলো যেন আগের থেকে বুঝতে পারতো। তাদের সে কাতর চাউনি আর ভয়ার্ত কম্পন এখনও আমার চোখে ভাসছে।
সে কী দৃশ্য, একটির পর একটি বলি হচ্ছে। চারিদিকে জয়ঢাকের বাদ্য আর সমবেত ভক্তবৃন্দের চিৎকার। চিৎকারটা ভক্তিতে না মাংসের লোভে বলতে পারি না, কিন্তু আমি সেখানে দাঁড়াতে পারতাম না।’ নিপীড়িতের যন্ত্রণা দেখে তাঁর হৃদয় কাঁদলেও তিনি কিন্তু দুর্বল চিত্তের ছিলেন না। অত্যাচারীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ছিলেন সোচ্চার। বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে দেশের যুবসমাজের একাংশ সশস্ত্র আন্দোলনে নামার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। মহারাষ্ট্রের শিবাজী উৎসবকে ঘিরে বাংলা ও মহারাষ্ট্রের চরমপন্থীদের মধ্যে যোগাযোগ নিবিড় হয়।
বাংলার যুবকরা বারুদমাখা পথে চলতে শুরু করে। দীনেশও সেই সরণি ধরলেন। যুক্ত হলেন বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স গুপ্ত সংগঠনে। ১৯২৬সালে ঢাকা বোর্ড থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে পাস করে মেদিনীপুরে বেড়াতে যান। সেখানে তাঁর দাদা যতীশচন্দ্র গুপ্ত ওকালতি করতেন। কিছুদিন থেকে আবার ঢাকায় এসে জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হন। যদিও সংগঠনে অতিরিক্ত সময় দেবার জন্য আই এস সি পাস করেননি সেবার। এরপর দলের নির্দেশে মেদিনীপুর কলেজে ভর্তি হন। শিক্ষালয়ের কাছাকাছি বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স এর শাখা স্থাপন করতে তিনি উদ্যোগী হন। মেদিনীপুরে বড়বাজারে অভয় আশ্রম নামের একটি দেশীয় পোশাকের দোকান ছিল।
এছাড়া তিলক পাঠাগার নামক একটি গ্রন্থাগারে প্রচুর দেশপ্রেম মূলক বইপত্র আসতো। বিপ্লবী মতাদর্শে বিশ্বাসী কিশোর যুবকরা ভিড় জমাতেন সেখানে। দীনেশ গুপ্তও সেখানে যাতায়াত করতেন। উদ্দেশ্য ছিলো উপযুক্তদের দলে টেনে আনা। বল্লভপুর মহল্লায় একটি আখড়া বানিয়ে দেহচর্চার কাজও শুরু করেছিলেন। কিছুদিন বাদে মেদিনীপুর কলেজ থেকে আই এ পাস করে পুনরায় ঢাকায় এসে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করেন বি এ পড়ার অভিপ্রায়ে। রায় কোম্পানি নামে একটি মদের দোকান ছিল ঢাকার রায়পুরে। স্বদেশীরা তখন পিকেটিং করছিল দোকানের সামনে। হঠাৎ সেখানে হাজির হয় পুলিস সুপার হডসন। এসেই ‍বিক্ষোভকারীদের মারধর শুরু করেন।
চারপাশে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি। ঝামেলার সময় সাইকেলে চেপে আসেন দীনেশ। রক্তাক্ত কর্মীদের দেখে অত্যন্ত উত্তেজিত স্বরে হডসনকে বলেন— ‘ওকে মারধর করা আপনার এক্তিয়ারের মধ্যে পড়ে না।’ শোনামাত্রই সাহেব রিভলভার তাক করে। অসীম সাহসী দীনেশ এ‍‌গিয়ে এসে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায় বন্দুকের নলের সামনে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে অস্ত্র খাপবদ্ধ করে চম্পট দিলেন সাম্রাজ্যবাদের অনুচরটি। সুভাষচন্দ্র বসুকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করতেন দীনেশ গুপ্ত। তাঁর বাণীতে উদ্বুদ্ধ হয়ে সংগঠনের কাজে আরো গভীর মনোনিবেশ করেন। অচিরেই মেদিনীপুরের শাখা সংগঠনটি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। পরিমল রায়, ফণিভূষণ কুণ্ডু, হরিপদ ভৌমিক, রামকৃষ্ণ রায়, শচীন কানুনগো প্রমুখরা যোগ দিলেন বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সে। দল করতে গিয়ে তিনি বুঝেছিলেন ধর্মীয় ভেদাভেদ অনেক ক্ষেত্রে শত্রুদের সুবিধা পাইয়ে দেয়।
ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কারকে তিনি ঘৃণা করেছেন। ১৯৩১সালের ১৮ই জুন আলিপুর সেন্ট্রাল জেল থেকে তাঁর বৌদিকে চিঠিতে লিখেছিলেন— ‘ভারতবাসী আমরা নাকি বড় ধর্মপ্রবণ। ধর্মের নামে ভক্তিতে আমাদের পণ্ডিতদের টিকি খাড়া হইয়া উঠে। তবে আমাদের মরণের এত ভয় কেন? বলি, ধর্ম কি আছে আমাদের দেশে? যে দেশে দশ বছরের মেয়েকে পঞ্চাশ বৎসরের বৃদ্ধ ধর্মের নামে বিবাহ করিতে পারে, সে দেশে ধর্ম কোথায়? সে দেশের ধর্মের মুখে আগুন। যে দেশে মানুষকে স্পর্শ করিলে মানুষের ধর্ম নষ্ট হয়, যে দেশের ধর্ম আজই গঙ্গার জলে বিসর্জন দিয়া নিশ্চিন্ত হওয়া উচিত।
সবার চাইতে বড় ধর্ম মানুষের বিবেক। সেই বিবেককে উপেক্ষা করিয়া আমরা ধর্মের নামে অধর্মের স্রোতে গা ভাসাইয়া দিয়াছি। একটা তুচ্ছ গোরুর জন্য, না হয় একটু ঢাকের বাদ্য শুনিয়া আমরা ভাই ভাই খুনোখুনি করিয়া মরিতেছি। এতে কি ভগবান আমাদের জন্য বৈকুণ্ঠের দ্বার খুলিয়া রাখিবেন, না খোদা বেহস্তে আমাদিগকে স্থান দিবেন?’ ১৯২৯সালের শেষ দিকে তিনি আবার ঢাকায় যান। সেই সময় ‘বিউলি ইনস্টিটিউটে’ গিয়ে শরৎচন্দ্রের ‘ষোড়শী’ নাটকটি দেখেন। বিপ্লবী নেতা সুপতি রায়ের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক ছিল। সুপতি রায় কলকাতা থেকে নির্দেশ পাঠান— বাংলার গভর্নরের ওপর নেপাল নাগ ও দীনেশ গুপ্ত আক্রমণ চালাবে। পরে সে প্রস্তাব বাতিল হয়। পরে রাইটার্স অভিযানের সিদ্ধান্ত নেন নেতারা। ১৯৩০সালের ৮ই ডিসেম্বর বিনয়, বাদল, দীনেশ ট্যাক্সি চে‍পে রওনা দিলেন মহাকরণের পথে।
লালবাড়ির সামনে নেমে নিজেদের শেষবারের মতো প্রস্তুত করে নিলেন। কোটের নিচে রিভলভার গোঁজা। গলায় মাফলার থাকায় কোমরে সাঁটানো আগ্নেয়াস্ত্র দেখা যাচ্ছে না। বিপ্লবী প্রফুল্ল দত্ত আগেই রাইটার্স বা মহাকরণের ভিতরের খুঁটিনাটি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। দোতলায় উঠে একবার থামলেন বিনয়। বারান্দা দিয়ে দেখলেন চারদিকে সবুজের সমারোহ। আলোয় দুনিয়া ভেসে যাচ্ছে। নিচে দাঁড়িয়ে জীতেন সেন। ডালহৌসির দিঘির ধারে অপেক্ষা করছেন। গুলির আওয়াজ পেলেই তিনি চলে যাবেন আলিপুর চিড়িয়াখানার নির্দিষ্ট স্থানে। যেখানে রসময় শূর ও অন্যান্যরা অপেক্ষা করছেন। একবার চোখাচোখি হলো জীতেন ও বিনয়ের। তারপর এগিয়ে চললেন সিম্পসনের ঘরের দিকে।
তাকে খতম করে এগোলেন বিচার বিভাগের সেক্রেটারি নেলসনের ঘরের দরজায়। নেলসন গুলির আওয়াজ পেয়ে বাইরে উঁকি মারতেই তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি। পায়ে আঘাত পেয়ে গড়িয়ে যান নেলসন। বিপ্লবীরা গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে বারান্দা দিয়ে দৌড়াতে লাগলেন। আহত হলেন বাংলা সরকারের প্রধান সেক্রেটারি টাউসেন্ড সাহেব, অ্যালবিয়ান, প্রেস্টিস। চার্লস টেগার্ট, মিস্টার গর্ডন, মিস্টার বার্ট বিরাট পুলিস বাহিনী নিয়ে হাজির হয়। উপস্থিত হলো গোর্খা বাহিনী। মহাকরণের অলিন্দ সেদিন রণক্ষেত্রের চেহারা। গুলির হুঙ্কার আর বারুদের তীব্র গন্ধে রুদ্ধশ্বাস কেরানিকুল ও তাঁদের সাহেববর্গ। বিদেশী শোষকদের কাঁপন ধরিয়ে দেন বিনয়, বাদল, দীনেশ। পুলিস একসময় সম্বিৎ ফিরে পেয়ে প্রতিরোধ শুরু করে। বিপ্লবীদের গুলিও প্রায় নিঃশেষ। তাঁরা একটা ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। মৃত্যুর পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে।
আর দেরি করলে বিপদে পড়ে যাবে বিপ্লবী আন্দোলন। কোনোমতেই জ্যান্ত ধরা দেওয়া চলবে না। বাদল মুখে পুরে দিলেন বিষের প্যাকেট। বিনয় কালবিলম্ব না করে জিভে ঢেলে দিলেন পটাশিয়াম সায়ানাইড। কিন্তু বিষে যদি প্রাণ না যায় সেই ভেবে রিভলভারটা চেপে ধরলেন গলার ঠিক নিচে। অবিচলভাবে ট্রিগার দাবালেন। গলার মাংস ছিঁড়ে গুলি মাথায় পৌঁছালো। রণক্লান্ত বীর রক্তাক্ত হয়ে লুটিয়ে পড়লেন মেঝেতে। তার আগে দীনেশ জ্ঞান হারিয়েছে। তিনিও বিষপান করেছেন, গুলি চালিয়েছেন নিজের দেহে। বাদল ঘটনাস্থলেই মারা যান। বিনয় আর দীনেশকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ১৩ই ডিসেম্বর বিনয় বসু মারা যান। নিজের ক্ষতস্থান দু’হাতে খুঁচিয়ে বিষাক্ত করে চলে গেলেন বীর বিপ্লবী। কিন্তু বেঁচে উঠলেন দীনেশ গুপ্ত। কিঞ্চিৎ সুস্থ হয়ে ওঠার পর তাঁকে পাঠানো হয় আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে। আলিপুর আদালতে গার্লিক সাহেবের এজলাসে বিচার শুরু হয়। ফাঁসির আদেশ হয়। দেশবাসী দীনেশকে বাঁচানোর জন্য জয়েন্ট ডিফেন্স কমিটি গড়ে হাইকোর্ট পর্যন্ত মামলা চালায়। কিন্তু স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল পুরানো আদেশই বহাল রাখে।
জেলে থাকার সময় তিনি বেশ কিছু চিঠিপত্র লিখেছিলেন। ‘মেঘ ও রৌদ্র’ নামে একটি গল্প লেখেন। যা ১৩৩৭বঙ্গাব্দের চৈত্র সংখ্যায় ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ফাঁসির আগের দিন মায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় বীর পু‍‌ত্রের। চোখের জল বাঁধ মানে না বৃদ্ধার। বুক মোচড়ানো হাহাকার ওঠে মায়ের হৃদয়জুড়ে। কাল আবার সূর্য উঠবে, পাখি ডাকবে, শুধু জাগবে না তাঁর প্রিয় ‘নসু’। সে তো হারিয়ে যাবে অন্য কোনোখানে। সাম্রাজ্যবাদীর বিষাক্ত ছোবলে নীল হয়ে লোপ পাবে তাঁর সন্তান। ছেলে জেলে বসে মাকে লিখেছিলেন— ‘মনে করিও তোমার এক পুত্রের পরিবর্তে ভারতের সমস্ত ছেলেকে তুমি পুত্ররূপে পাইয়াছ। তুমি তাদের সকলের মা। তুমি তাদের সকলকে তোমার ‘নসু’র মতো ভালবাসো। আপন হৃদয়কে যদি বিস্তার করিতে পার, তবে শান্তি পাইবে। ভালবাসো দুঃখী, কাঙাল, অনাথ, আতুরকে।
আপন সন্তানের মতো ভালবাসো। ক্ষুদ্র সংসারের গণ্ডির বাইরে ভালবাসা বিলাইয়া দাও, অপার আনন্দ পা‍‌ইবে।’ চারপাশে গাঢ় অন্ধকারের প্রলেপ। মাঝে মাঝে নিশাচর প্রাণীদের চলাফেরার শব্দ। কাছের কোনো বুনো ঝোপ থেকে হালকা মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে। রাত বাড়লে কবরের স্তব্ধতা নেমে আসে আলি‍পুর জেলজুড়ে। খানিক দূরে দূরে লাগানো দেওয়াল লণ্ঠনের ঝাপসা আলো কেমন যেন মায়া ছড়ায়। কয়েদীরা কেউ ঘুমায়নি। ৭ই জুলাই ১৯৩১। আজ আরেকটি নক্ষত্র পতন ঘটবে। খানিকবাদে পাথর ঢাকা বারান্দায় শোনা গেলো ভারী বুটের সদম্ভ উপস্থিতি।
একসঙ্গে একাধিক। রাত শেষ হতে আরো খানিকটা বাকি। ফাঁসির মঞ্চের সন্নিকটের কুঠরিটা খুলে গেল। উর্দিধারী পুলিসসহ এলেন আইরিশ জেলার মিস্টার সোয়ান। দ্রুত স্নান সেরে তৈরি হয়ে নিলেন দীনেশ গুপ্ত। তারপর এগিয়ে চললেন শেষ যাত্রায়। কোনো কিছুর লোভে এই মানুষগুলি জীবনপণ করেনি। কেবলমাত্র দিনবদলের স্বপ্ন দু’‍চোখে মেখে নেমেছিলেন লড়াইয়ের ময়দানে। অর্থ নয়, স্বচ্ছলতা নয়, গদি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নয়। শুধুমাত্র মানুষের প্রতি ভালোবাসার অমোঘ টানে ছুটেছিলেন অগ্নিঝরা পথে। বন্দীদশায় লিখেছিলেন,‍‌ ‘যে যাকে ভা‍‌লোবাসে তার জন্য প্রাণ দিতেও কি সে কুণ্ঠিত হয় কখনও? মানুষের বড় বড় কাজ দেখে আমরা অপরিসীম বিস্ময়ে অবাক হয়ে থাকি।
ভাবি, একাজ সে করলো কেমন করে? কিন্তু মূল খুঁজলে পাওয়া যাবে ভালোবাসার প্রস্রবণ। তারই সরস রসে সিঞ্চিত হয়ে মানুষ দিতে পারে হাসিমুখে আত্মবিসর্জন।’ ১৯৪৭সালের ১৫ই আগস্ট অনেক রক্ত ঘাম অশ্রুর বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। প্রফুল্ল চাকী, ক্ষুদিরাম বসু, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, কানাইলাল দত্ত, বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত, দীনেশ গুপ্তের মতো বিপ্লবীদের আত্মবলিদানের মধ্যে দিয়ে স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছি আমরা। তাঁরা আছেন আমাদের হৃদয়ে। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের শহীদদের প্রতি রয়েছে আমাদের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ভালোবাসা। লড়াই আজও শেষ হয়নি। সাম্রাজ্যবাদের থাবা এখনও উদ্যত। মুক্তির যুদ্ধে আজও প্রেরণা জোগায় এই অমর শহীদরা।
বিনয়, বাদল, দীনেশ। নবপ্রজন্মের অনেকেই হয়তো এদের চেনেনা। বাংগালী স্বাধীনতার তিন চিরঞ্জীব শহীদ এরা। তাদেরই একজন শহীদ দীনেশ গুপ্ত। আজ যাচ্ছে অমর সেই বিপ্লবী দীনেশ গুপ্তের জন্মদিন। কমরেড ইসমাইল হোসেন কাতার থেকে তার ফেইচবুকে চিরঞ্জীব এই বিপ্লবীকে নিয়ে কিছু লিখেছেন। ইসমাইল হোসেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল কাতার ‌ও গণজাগরণ মঞ্চ কাতার শাখার সভাপতি। লিখেছেন তার জন্মদিনকে স্মরণ করে অন্তরের অঞ্জলি মিশিয়ে। শহীদ দীনেশের জন্মদিনে তার স্মরণে আমরা ইসমাইল হোসেনের লেখাটি এখানে পত্রস্ত করলাম।
কমরেড ইসমাইল হোসেন স্বাধীনতা সংগ্রামী, বিপ্লবী শহীদ দীনেশচন্দ্র গুপ্ত (জন্মঃ- ৬ ডিসেম্বর, ১৯১১ – মৃত্যুঃ- ৭ জুলাই, ১৯৩১) ঢাকা কলেজে পড়ার সময় ১৯২৮ সালে তিনি ‘ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস’-এর কলকাতা সেশনের প্রাক্কালে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস সংগঠিত বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সে যোগদান করেন। শীঘ্রই বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স একটি সক্রিয় বিপ্লবী সংগঠনে পরিবর্তিত হয়। দলের তরফ থেকে দীনেশকে মেদিনীপুরে শাখা স্থাপনের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
মেদিনীপুরে এসে দল সংগঠন ও সদস্য সংগ্রহের পাশাপাশি পড়াশোনাও চালিয়ে যান তিনি। তাঁর দল কুখ্যাত ব্রিটিশ পুলিশ অফিসারদেরকে নিশ্চিহ্ন করার পরিকল্পনা করে। স্থানীয় বিপ্লবীদের আগ্নেয়াস্ত্র চালনা শেখানোর ব্যবস্থা করা হয়। তাঁর প্রশিক্ষিত বিপ্লবীরা ডগলাস(Douglas), বার্জ(Burge) এবং পেডি(Peddy)–এই তিনজন জেলা ম্যাজিস্ট্রটকে পরপর নিধন করেছিল। রাইটার্স ভবনে হামলা সংগঠনটি জেলের ইন্সপেক্টর জেনারেল কর্নেল সিম্পসনকে টার্গেট করেছিল যে কিনা জেলখানার বন্দীদের উপর পাশবিক নির্যাতনের জন্য কুখ্যাত ছিল।এই বিপ্লবীরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে তাঁরা শুধু সিম্পসনকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হবেন না, বরং কলকাতার ডালহৌসি স্কোয়ারে অবস্থিত ব্রিটিশ শাসকদের সচিবালয় রাইটার্স ভবনে আক্রমণ করে ব্রিটিশ অফিস পাড়ায় ত্রাস সৃষ্টি করবেন । ১৯৩০ সালের ৮ই ডিসেম্বর দীনেশ তাঁর দুই সঙ্গী বিনয় বসু এবং বাদল গুপ্তসহ ইউরোপীয় পোশাকে রাইটার্স বিল্ডিংয়ে প্রবেশ করেন এবং সিম্পসনকে গুলি করে হত্যা করেন। ব্রিটিশ পুলিশ গুলি শুরু করে।যার ফলশ্রুতিতে এই তিন তরুণ বিপ্লবীর সাথে পুলিশের একটি সংক্ষিপ্ত বন্দুকযুদ্ধ হয়।
টোয়াইনাম (Twynum), প্রেন্টিস(Prentice) এবং নেলসন(Nelson)-এর মত অন্য কিছু অফিসার গোলাগুলিতে আহত হয়। পুলিশ দ্রুতই তাঁদেরকে পরাভূত করে ফেলে।কিন্তু এই তিনজনের গ্রেফতার হওয়ার কোনো ইচ্ছে ছিল না। বাদল গুপ্ত পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে নিয়েছিলেন, অন্যদিকে বিনয় এবং দিনেশ নিজেদের রিভলবার দিয়ে নিজেদেরকেই গুলি করেছিলেন। বাদল তৎক্ষণাৎ মৃত্যু বরণ করলেও ভীষণভাবে আহত মুমূর্ষু অবস্থায় দীনেশ ও বিনয় ধরা পড়েন। উভয়কেই মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও সেখানেও তাদের উপর ভয়ঙ্কর অত্যাচার চালানো হয়।
পুলিশ কমিশনার ট্রেগার্ট অচেতন বিনয়ের হাতের আঙুলগুলি বুটের আঘাতে ভেঙে দেয়। আরও অত্যাচার এড়াতে মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র বিনয় মাথার ব্যান্ডেজের ভেতর দিয়ে মগজে আঙুল ঢুকিয়ে ডিসেম্বরের ১৩ তারিখ (১৯৩০ সাল) মৃত্যুকে বরণ করেন। এদিকে ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত সেবায় সুস্থ হয়ে ওঠা দীনেশের উপর চলে অবর্ণনীয় নির্যাতন। এভাবে ক্রমাগত নির্যাতন এবং তারপর চিকিৎসায় সুস্থ করে আবার নির্যাতন চলতে থাকে দীনেশের উপর। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে বিচারের নামে শুরু হয় প্রহসন। শেষমেষ তার বিরুদ্ধে ফাঁসীর আদেশ দিয়ে তাকে কন্ডেমড সেলে পাঠানো হয়।
ইংরেজ সরকার দীনেশের ফাঁসি কার্যকর করার নির্দেশ দেয়। ছবি উইকিপিডিয়া থেকে ১৯৩১ সালের ৭ জুলাই, ভোরে মাত্র ১৯ বছরের এক তরতাজা তরুণ প্রাণ স্নান শেষে জীবনকে বিদায় জানাতে নিঃশঙ্ক চিত্তে ফাঁসীর মঞ্চে এগিয়ে গেলেন। হাসিমুখে নিজের হাতে ফাঁসীর দড়ি মালার মত গলায় দিলেন।
কর্মরত কারা কর্তৃপক্ষ এসময় জানতে চাইলেন ‘তুমি কি কিছু বলতে চাও? ‘আমাদের বলার অধিকার কারা কেড়ে নিয়েছে, তা তোমরাই ভাল জান। তাই ডু ইওর ডিউটি’- তরুণ দীনেশের ধীর স্থির কণ্ঠস্বর থেকে উত্তর ভেসে এল। এরপর তরুণের হৃদয়ের গভীর থেকে উচ্চারিত স্বাধীনতার মন্ত্র ‘বন্দেমাতরম’ ধ্বনির অনুরণন আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে দিয়ে একটি অবিনাশী জীবনের দীপশিখা নিভে গেল। গুরুত্ব বাংলাসহ ভারতের অন্যান্য অংশে বিনয়, বাদল এবং দীনেশকে শহীদ হিসেবে সম্মান করা হয়। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে বিনয়-বাদল-দীনেশের নামানুসারে কলকাতার ডালহৌসি স্কোয়ারের নাম পালটে রাখা হয় বি-বা-দী বাগ। প্রাথমিক জীবন বিপ্লবী দীনেশ গুপ্তের জন্ম হয় তদনীন্তন ঢাকা জেলার (অধুনা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মুন্সিগঞ্জ জেলা) যশোলঙে। তাঁর পিতার নাম সতীশচন্দ্র গুপ্ত ও মায়ের নাম বিনোদিনী দেবী। দীনেশ গুপ্তের ডাকনাম ছিল নসু। চার ভাই ও চার বোনের মধ্যে দীনেশ ছিলেন পিতামাতার তৃতীয় সন্তান।
সতীশচন্দ্র ছিলেন ডাক বিভাগের কর্মচারী। চাকরির সূত্রে তিনি কিছুকাল গৌরীপুরে অবস্থান করেন। গৌরীপুরের পাঠশালাতেই দীনেশের শিক্ষারম্ভ। পরে নয় বছর বয়সে ভর্তি হন ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে। প্রথম দিকে দীনেশ ঢাকার গ্যান্ডারিয়া অঞ্চলে দাদুর বাড়িতে বাস করতেন, পরে উয়াড়িতে পৈত্রিক বাসভবনে চলে আসেন। বাল্যকাল থেকেই দীনেশ ছিলেন নির্ভীক, বেপরোয়া ও বাগ্মী। এই সময় থেকেই তাঁর মনে স্বদেশ চেতনা ও ব্রিটিশ বিরোধিতার আদর্শ সঞ্চারিত হয়েছিল।
তথ্যসূত্র:
১. অসিতাভ দাশ/শহীদ দীনেশ গুপ্তের জীবন, সাহিত্য ও পত্রাবলী
২. বঙ্গেশ্বর রায়/মনে রেখো

 

 

Leave a Reply Cancel reply