শেখ রাসেল: একটি উজ্জ্বল চিরঞ্জীব নক্ষত্র | Sheikh Rasel

ছাড়পত্র কবিতায় নবজাতকের জন্মগত অধিকার এবং নিরাপদ পৃথিবীর দাবি জানিয়েছেন কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য।

যে শিশু ভূমিষ্ঠ হলো আজ রাতে

তার কাছে খবর পেলুম:

সে পেয়েছে ছাড়পত্র এক

নতুন বিশ্বের দ্বারে তাই ব্যক্ত করে অধিকার

জন্মমাত্র সুতীব্র চিৎকারে।

(ভট্টাচার্য, সুকান্ত; মাওলা ব্রাদার্স; বাংলাবাজার, ঢাকা; জুলাই ১৯৯১; পৃ. ১৯)

রাসেলও সুতীব্র চিৎকার, মুষ্টিবদ্ধ হাতে ব্যক্ত করেছিল তার জন্মগত অধিকার, বেঁচে থাকার অধিকার, হ্যাঁ নিরাপদ পৃথিবীর অধিকার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমৃত্যু লড়াই করে আদায় করেছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের মাটি ও মানুষের যৌক্তিক দাবি। বাংলাদেশ নামক ভূ-খণ্ড নির্মাণের মধ্য দিয়ে নিশ্চিত করেছিলেন প্রতিটি মানুষের স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার অধিকার। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই কালোরাতে স্বাধীনতাবিরোধী দেশদ্রোহী মীরজাফরদের হাতে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার, দেশনায়ক বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবার, অলৌকিকভাবে বেঁচে যান দেশরত্ন দুই কন্যা। সপরিবারে শহীদ হয়ে তিনি দেশপ্রেমের চরম মূল্য দেন। এই নিষ্ঠুরতার এখানেই শেষ নয়।

আমাদের বন্ধু শেখ রাসেল,শেখ রাসেল এর জীবন কাহিনী জেনে নিন। মানবতার প্রতীকি শিশু শেখ রাসেল

নৃশংস জানোয়াররা অবুঝ রাসেলকে তার অস্তিত্বের সর্বস্ব বাংলাদেশ নামক সেই রক্তাক্ত ভূলুন্ঠিত মানচিত্র প্রদক্ষিণ করিয়ে, সবশেষে মায়ের কোলে আছড়ে পড়া শিশুটির ছোট্ট হৃৎপিণ্ডের অসীম সম্ভাবনাকে বুলেটের আঘাতে ঝাঁজরা করে ফেলে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই ক্ষমাহীন ভয়ংকর রাতের নির্মম অসহনীয় বেদনার সমাধি আজ সুদীর্ঘ ৪৬ বছর ধরে বাঙালি বহন করে চলছে। বেঁচে থাকলে আজ বাংলার উজ্জ্বল নক্ষত্র রাসেল সোনা ৫৮ বছরে পা রাখতো। হয়ত সে জাতির পিতার মতোই এদেশের আপামর জনগণের কাণ্ডারি হতো। হয়ত জননেত্রী শেখ হাসিনার ছায়াসঙ্গী হয়ে দেশের মানুষের পাশে থাকত অনুক্ষণ।

স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘জন্মেছিস যখন দাগ রেখে যা’ বিস্ময়কর এই ছোট্ট মানুষটাও পৃথিবীতে এসেছিল দাগ রাখার জন্যই। ১০ বছর নামক সময়ের সীমানায় আবদ্ধ জীবন তারই স্বাক্ষর দেয়। রাসেলের প্রিয় হাসু আপা আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার স্মৃতিচারণে অনেক ক্ষুদ্র-বৃহৎ-মহৎ তাৎপর্যপূর্ণ চিহ্ন দৃষ্টিগোচর হয়। এই চিহ্ন অনন্ত প্রত্যাশার দিকেই বারবার তর্জনী তুলে। যাকে বাংলার মাটি ও মানুষ চিরজীবনের জন্য হারিয়ে ফেলেছে কিন্তু তার স্বল্প সময়ের জীবনের উজ্জ্বল প্রতিভার অমূল্য ইতিহাসখণ্ড একটি চিরঞ্জীব নক্ষত্রের মতো প্রজন্ম পরম্পরা আলোর পথ দেখিয়ে যাচ্ছে।

Sheikh Rasel-শেখ রাসেল
Sheikh Rasel-শেখ রাসেল

বাংলার মাটির সন্তান বঙ্গবন্ধুর মাঠিঘেঁষা মন ও মনন, মাটির মানুষের সঙ্গে যাপিত জীবনের আদর্শিক আবহে ধানমন্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বরের ‘বঙ্গবন্ধু ভবনে’ তার প্রিয় হাসু আপার কক্ষে জন্ম নেওয়া, হাঁটি হাঁটি পা পা করে বেড়ে ওঠা রাসেলের নিষ্পাপ জীবনের প্রতিটি মুহুর্ত কোনো না কোনোভাবে বিস্ময়কর সাহস, সততা, বিনয় আর নানা শিষ্টাচারের ভেতর দিয়ে অতিবাহিত। বিচিত্র অনুভবে আপ্লুত হই, প্রাণিত হই এই ভেবে যে, এই ছোট্ট মানুষটা এতো মানবিকবোধ, দেশপ্রেম, সাংগঠনিক ক্ষমতাসহ শিষ্টাচারের নানা পাঠ আতস্থ করলো কেমন করে? বিস্মিত হই না যখন বাঙালি জাতির পিতা, বাংলাদেশ নামক স্বাধীন ভূখণ্ডের স্বপ্নদ্রষ্টা, বাস্তবায়নের দ্রষ্টা বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্মের দিকে তাকাই। পূর্ববঙ্গ তথা স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি মাটিকণা, শস্যদানা, জীবজন্তু পশু-পাখি আর মানুষের প্রতি তাঁর ছিল পরম মমতা, চরম দায়িত্ববোধ। আপসহীন দায়বদ্ধতার জন্য বারবার তিনি কারাবরণ করেছেন, নির্যাতিত হয়েছেন, পরিবারকে মৃত্যুঝুঁকিতে ফেলেছেন কিন্তু ভয় পাননি, আশাহত হননি। শেখ রাসেল নামক ছোট্ট মানুষটা তো পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, অবিস্মরণীয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমানেরই আত্মজ। সুতরাং পিতার অসাধারণ বীজমন্ত্র, সন্তান শেখ রাসেলের রক্তে বিদ্যমান ছিল এটাই সত্য।

পিনাকী ভট্টাচার্য এর জীবনী | FULL BIOGRAPHY OF PINAKI BHATTACHARYA

রাসেলের নামকরণের স্মৃতিচারণ করে আমাদের ছোট রাসেল সোনা গ্রন্থে জননেত্রী লিখেছেন-

আব্বা বার্ট্রান্ড রাসেলের খুব ভক্ত ছিলেন, রাসেলের বই পড়ে মাকে বাংলায় ব্যাখ্যা করে শোনাতেন।

মা রাসেলের ফিলোসফি শুনে শুনে এত ভক্ত হয়ে যায় যে, নিজের ছোট সন্তানের নাম রাসেল রাখেন।

(হাসিনা, শেখ; আমাদের ছোট রাসেল সোনা, বাংলা শিশু একাডেমি, ১৭ মার্চ ২০১৮; পৃ.১৯)

বলা হয়, ব্যক্তির জীবনে নামের প্রভাব অনিবার্য। ছোট্ট মানুষটার আরও ছোট জীবনের দিকে তাকালে এর অফুরন্ত সত্যতা প্রমাণিত হয়।

ছোট্ট মানুষটা জাতির পিতার, পিতা ছিলেন বললে অত্যুক্তি হবে না, বাবা যেমন তার সন্তানকে অষ্টপ্রহর নিজের কাছে রাখতে চায়, রাসেলও ঠিক তেমনি বাংলার মানচিত্র সমান পিতাকে তার ছোট্ট বুকটা দিয়ে সারাক্ষণ আগলে রাখতে চাইতো।

জননেত্রী স্মৃতিচারণ করেছেন, ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি প্রায় তিন বছর পর আব্বা গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যখন মুক্তি পান, তখন রাসেলের বয়স চার পার হয়েছে। … এর মধ্যে ওর একটা জিনিস আমরা লক্ষ্য করলাম, খেলার ফাঁকে ফাঁকে কিছুক্ষণ পরপরই আব্বাকে দেখে আসত। আব্বা নিচে অফিস করতেন। আমরা তখন দোতলায় উঠে গেছি। ও সারাদিন নিচে খেলা করত। আর কিছুক্ষণ পরপর আব্বাকে দেখতে যেত। মনে মনে বোধ হয় ভয় পেত যে, আব্বা বুঝি আবার হারায়। (প্রাগুক্ত,পৃ.২৫)

অন্যত্র স্মৃতিচারণ করেছেন-‘রাসেল আব্বাকে ছায়ার মতো অনুসরণ করতো। আব্বাকে ছাড়তে চাইত না।’

(প্রাগুক্ত. পৃ.৩৩)

বঙ্গবন্ধু কারাগারের রোজনামচা গ্রন্থে ১৯৬৭ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি স্মৃতিচারণ করে প্রিয়তম পুত্র রাসেলের কথা বুকভরা বেদনা নিয়ে লিখেছেন-

দুই বৎসরের ছেলেটা এসে বলে ‘আব্বা বাড়ি চলো।’ কি উত্তর ওকে আমি দেবো? ওকে ভোলাতে চেষ্টা করলাম। ওতো বোঝে না আমি কারাবন্দি। ওকে বললাম তোমার মার বাড়ি তুমি যাও, আমার বাড়ি আমি থাকি। আবার আমাকে দেখতে এসো। ও কি বুঝতে চায়! কি করে নিয়ে যাবে এই ছোট্ট ছেলেটা ওর দুর্বল হাত দিয়ে মুক্ত করে এই পাষাণ প্রাচীর থেকে?! (রহমান, শেখ মুজিবুর; কারাগারের রোজনামচা; বাংলা একাডেমি, মার্চ ২০১৭, ঢাকা, পৃ.২৪৯)

পিতার অদর্শনে অবিরাম কান্নারত পুত্রের কান্না থামাতে মা বাধ্য হয়ে ছেলেকে বলে, তাকে আব্বা ডাকতে।

Sheikh Rasel-শেখ রাসেল

তারপর কারাগারে বাবার সঙ্গে দেখা হলেও ছোট মানুষটা, মাকেই বারবার আব্বা বলে সম্বোধন করে। আব্বাকে বাড়ি নেওয়ার জন্য আর বায়না ধরে না। জাতির পিতার গভীর বেদনার সুপ্ত প্রকাশ- ‘আমার উপর অভিমান করেছে বলে মনে হয়। এখন আর বিদায়ের সময় আমাকে নিয়ে যেতে চায় না।’ (প্রাগুক্ত, পৃ. ২২১) পিতা-পুত্রীর দিনলিপির মধ্য দিয়ে বাবা-ছেলের অমৃতসম ভালোবাসার বেদনাভরা মুহূর্তগুলো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। হয়ত ছোট্ট রাসেলের মনে চেতনে-অবচেতনে জাগ্রত হয়েছিল এই অনুভূতি যে, বাবা যেমন তার তেমনি গোটা দেশটারও।

বাবার সবকিছুই তার পছন্দের। পোশাক-আশাক, কথা বলা, বসার ধরন, হাঁটাচলা – সব। আসলে গোটা বাবাটাই তার সব চেয়ে প্রিয় ছিল। তাই তো ছায়াসঙ্গী হয়ে থাকতে চাইত। হয়ত আজ রাসেল বেঁচে থাকলে বঙ্গবন্ধুর শুধু কায়ারূপই নয়, পিতার সবচেয়ে প্রিয় দেশটাকে ভালোবাসত পিতার মতো করেই। তাঁর আদর্শের প্রতিভূ হয়ে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার অসমাপ্ত কর্ম সম্পাদনে অমিত সাহস আর বিশ্বাসে জননেত্রীর পাশে দাঁড়াতো।

দেশ ও জাতির চরম সংকটকালীন পরিস্থিতিতে ছোট্ট মানুষটির কর্মকাণ্ডে আমরা বারবার চমৎকৃত হই।

যদিও এই ছোট্ট মানুষটার কণ্ঠস্বর পুলিশের কানে পৌঁছাত না, কিন্তু রাসেল হরতালের কথা বলবেই।

বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে হরতাল হরতাল বলে চিৎকার করত। স্লোগান দিত জয়বাংলা। (প্রাগুক্ত,

হাসিনা, শেখ; পৃ. ২৫)

বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তিবাহিনীর সর্বকনিষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন ‘ছোট মানুষটা’অভিহিত শেখ রাসেল। জন্মেই যেন পিতার মুক্তি মন্ত্রণা তার রক্ত মাংস মেদ মজ্জা শিরা উপশিরায় অপ্রতিরোধ্যভাবে মিশে গিয়েছিল। তাই তার বেঁচে থাকা এই ক্ষুদ্র শৈশব জীবনটা অসীম হয়ে ওঠে, যখন দেখি তার ছেলেবেলা শুধুমাত্র শিশুদের জীবন না হয়ে প্রতিটি কাজে বারবার উজ্জ্বল হয়ে ওঠে মহীরুহ পিতার আদর্শ, দেশপ্রেম, মানবিকতা, দায়িত্বশীলতাসহ বিচিত্র গুণাবলীর প্রকাশ। এখানেই রাসেল আর শিশু থাকে না, হয়ে ওঠে পরিণত মানুষের সম্ভাব্য রূপ। পিতার অঙ্কুরিত বীজকণা। তাই ভাইকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর অভিমতে দ্বিমত পোষণের অবকাশ থাকে না।

ওর সব কিছুই যেন ছিল ব্যতিক্রম। অত্যন্ত মেধাবী তার প্রমাণ অনেকবার পেয়েছি। চলাফেরায় বেশ সাবধানী কিন্তু সাহসী ছিল। সহসা কোনো কিছুতেই ভয় পেত না। (প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭)

অন্যত্র বলেছেন- কাপড়-চোপড়ের ব্যাপারে ছোটবেলা থেকেই তার নিজের পছন্দ ছিল। তবে একবার একটা পছন্দ হলে তা আর ছাড়তে চাইত না। ওর একটা আলাদা ব্যক্তিত্ব ছিল। নিজের পছন্দের ওপর বিশ্বাস ছিল। খুব স্বাধীন মত নিয়ে চলতে চাইত। ছোট মানুষটার চরিত্রের দৃঢ়তা দেখে অবাক হতে হতো। বড় হলে সে যে বিশেষ কেউ একটা হবে তাতে কোনো সন্দেহ ছিল না। (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৬)

অথচ হায়েনাদের নির্মমতায় খুন হয়ে গেল তার অপার সম্ভাবনা।

বঙ্গবন্ধুর গভীর দেশপ্রেম, অসাধারণ নেতৃত্ববোধ, সাংগঠনিক ক্ষমতা উত্তরাধিকার সূত্রে ছোট্ট রাসেলের মন ও মস্তিষ্কে ক্রিয়াশীল ছিল। তাই তো সে শিশুদের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য থেকে অনেক বেশি ব্যতিক্রম ছিল। খেলাধুলারভেতর দিয়ে কিছু জানার, শেখার, জানানোর, শেখানোর এক স্বভাবজাত প্রবণতা তার ছিল। তখন তার বয়স সাত কি আট। জননেত্রী স্মৃতিচারণ করেছেন- টুঙ্গিপাড়া গ্রামের বাড়িতে গেলে তার খেলাধুলার অনেক সাথী ছিল। গ্রামের ছোট ছোট অনেক বাচ্চাকে জড়ো করত। তাদের জন্য ডামি বন্দুক বানিয়ে দিয়েছিল। সেই বন্দুক হাতে তাদের প্যারেড করাত।

প্রত্যেকের জন্য খাবার কিনে দিত। রাসেলের খুদে বাহিনীর জন্য জামা-কাপড় ঢাকা থেকেই কিনে দিতে হতো। নাসের কাকা রাসেলকে এক টাকার নোটের বান্ডিল দিতেন। খুদে বাহিনীকে বিস্কুট লজেন্স কিনে খেতে টাকা দিত। প্যারেড শেষ হলেও তাদের টাকা দিতো। (প্রাগুক্ত; পৃ. ৩২)

মহান রাষ্ট্রনায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মজ রাসেল পিতার জীবন ও কর্মের ভেতর দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা জীবন চেতনে-অবচেতনে রন্ধ্রে রন্ধ্রে লালন করত। হরতাল, মিছিল, মিটিং, গৃহবন্দি জীবন, কারাবাস আর মুক্তিযোদ্ধাদের বীরগাঁথা তার ছোট্ট জীবনটাতে ছেয়ে ছিল। বড় দুই ভাই যুদ্ধ শেষে বাড়ি ফিরলে রাসেলের সকল আগ্রহের কেন্দ্র ছিল মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনা। খুদে বাহিনীকে ডামি বন্দুক দিয়ে ট্রেনিং প্রশিক্ষক রাসেল ছিল জাতির পিতার ভবিষ্যৎ কর্ণধার। তার স্বপ্ন ছিল আর্মি অফিসার হওয়ার। অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে গেল সেই স্বপ্ন।

একজন পরিণত মানুষের মতো তীব্র দুঃখবোধকে লুকিয়ে রাখা, কষ্টকে বুকে চেপে নিশ্চুপ থাকার মতো বিস্ময়কর শক্তি ছিল এই ছোট মানুষটার। কে জানে কোথা থেকে সে এতো শক্তি পেত? ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ সেই ক্ষমাহীন কালোরাতের পরের দিন ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। পাক সরকারের নির্দেশে তিনি কারারুদ্ধ হলেন। বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মেজ ছেলে শেখ জামাল আর কনিষ্ঠ পুত্র আদরের রাসেলকে নিয়ে গৃহে অন্তরীণ হলেন। দুর্বিষহ সেই সময়ে ছোট্ট মানুষটার মানসিক অবস্থার স্মৃতিচারণ করেন জননেত্রী- মনের কষ্ট কীভাবে চেপে রাখবে আর কী ভাবেই বা ব্যক্ত করবে? চোখের কোণে সবসময় পানি। যদি জিজ্ঞাসা করতাম কি হয়েছে রাসেল? বলত ‘চোখে ময়লা’। ঐ ছোট্ট বয়সে সে চেষ্টা করত মনের কষ্ট লুকাতে। (প্রাগুক্ত, পৃ. ২৭)

এই অবুঝ শিশুর ব্যথাকে ধারণ করার আশ্চর্য ক্ষমতা দেখে প্রশ্ন জাগে রাসেল কী তবে বঙ্গবন্ধুরই প্রতিমূর্তি? হ্যাঁ তাই-ই। সেই ক্রান্তিলগ্নে বঙ্গবন্ধু যেমন অমিত সাহস অসহনীয় সহিষ্ণুতায় তাঁর বিশাল বুক দিয়ে সামলে রেখেছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের মাটি ও মানুষকে; ছোট রাসেলও যেন তেমনি তার ছোট হৃৎপিণ্ডে লুকিয়ে রেখেছিল প্রাণপ্রিয় পিতাকে না দেখার গভীর বেদনা, গৃহে অন্তরীণ জীবনের সকল যন্ত্রণা।

শেখ রাসেল। Sheikh Rasel Amader Bondhu | পাঁচটি রচনা শেখ রাসেল ২০০ শব্দ, ৫০০, ১০০০ শব্দ

আজ বিশ্বজুড়ে প্রাণীহত্যার বিরুদ্ধে যে আন্দোলন চলছে সেই প্রাণকে রক্ষার এক বিস্ময়কর অব্যক্ত আকুতি তার ছিল। কবুতরের মাংস না খাওয়া। মাছকে নিধন না করা এ এক নীরব প্রতিবাদ তার। জননেত্রীর স্মৃতিচারণ- রাসেলকে কবুতরের মাংস দিলে কোনোদিন খেত না। এতো ছোট বাচ্চা কীভাবে সে টের পেত কে জানে!

ওকে আমরা অনেকভাবে চেষ্টা করেছি। ওর মুখের কাছে নিলেও খেত না। মুখ ফিরিয়ে নিত, শতচেষ্টা করেও কোনোদিন কেউ ওকে কবুতরের মাংস খাওয়াতে পারেনি। (প্রাগুক্ত; পৃ.২১)

বাড়িতে পোষা কবুতরগুলোকে রাসেল খাবার খাওয়াতো, তাদের সঙ্গে খেলতো। তবে কী রাসেলের ছোট মনে প্রশ্ন জেগেছিল রক্ষক কী করে ভক্ষক হয়? খেলার সাথীকে মেরে ফেলা যায় কি? যায় না।

স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন- জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জনে সেবিছে ঈশ্বর। আমাদের রাসেল ছিল ঈশ্বরের সেবক জীবের রক্ষক। মানুষ নামক তথাকথিত হিংস্র জানোয়াররা তার অমিত সম্ভাবনার ছোট্ট প্রাণটাকে স্তব্ধ করে দিল। মানব ইতিহাসের মানচিত্রে চিরকালের জন্য প্রশ্নবিদ্ধ করে দিল মানুষ এবং মানবতার সংজ্ঞার্থ।

জননেত্রী অন্যত্র স্মৃতিচারণ করেছেন- ‘রাসেলের মাছ ধরার খুব শখ ছিল। কিন্তু মাছ ধরে আবার ছেড়ে দিত।’(প্রাগুক্ত; পৃ.১২) ছোট্ট মানুষটা কী করে বুঝতো প্রাণ বেঁচে থাকার জন্য নিধনের জন্য নয়। হত্যা যে মহাপাপ। প্রাণের প্রতি প্রাণীর প্রতি তার ছিল গভীর ভালোবাসা অথচ পশুরা তার ছোট প্রাণটাকে নির্মমভাবে কেড়ে নিল।

জাতির পিতার শ্রেণিহীন শোষণহীন অসাম্প্রদায়িক আদর্শ বীজকণা রাসেলের রক্ত মজ্জায় লীন ছিল। ১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে আগরতলা ষড়যন্ত্রের মিথ্যা মামলায় যখন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি রাখা হয়, তখন ছোট মানুষটা বুকভরা অপার বেদনা নিয়ে নিশ্চুপ হয়ে যায়। সেই সংকট সময়ের স্মৃতিচারণ করেন জননেত্রী- রাসেলকে সময় দিতে পারি না বেশি। আম্বিয়ার মা সবসময় দেখে রাখত। এমনি খাবার খেতে চাইত না।

কিন্তু রান্নাঘরে যখন সবাই খেত তখন ওদের সাথে বসত। পাশের ঘরে লাল ফুল আঁকা থালায় করে, পিঁড়ি পেতে বসে কাজের লোকদের সাথে ভাত খেতে পছন্দ করত। (প্রাগুক্ত; পৃ.২৩)

ইউনির্ভাসিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র মেধাবী রাসেল যেমন সাহসী ছিল তেমনি ছিল তার প্রখর স্মরণশক্তি। পুলিশকে দেখে ও পুলিশ কাল হরতাল, কিংবা জয় বাংলা বলতে যেমন সে ভয় পেত না, তেমনি পাকসেনাদের অস্ত্র পরিষ্কার দেখতেও তার ভয় লাগত না। সে শুনে শুনে অনেক অস্ত্রের নাম মুখস্থ করে ফেলেছিল।

ওলা পিঁপড়া ছোট্ট মানুষটাকে কামড়ে দিলে, সে পিঁপড়ার নাম দেয় ‘ভুট্টো’। রাষ্ট্রীয় পরিবারের সন্তান রাসেল কী তবে জানত ‘ভুট্টো’র নির্মমতার কথা? তাই হয়ত ওলা পিঁপড়া তার কাছে ‘ভুট্টো’র মতো নির্মম মনে হয়েছিল।

রাসেলের শিষ্টাচার অনুসরণযোগ্য। এতটুকু রাসেল অতিথি আপ্যায়ন করতে ভালোবাসত। শিক্ষকের প্রতি তার অগাধ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার স্মৃতিচারণ করে জননেত্রী বলেছেন- প্রতিদিন শিক্ষয়িত্রীকে দুটো করে মিষ্টি খেতে হবে। আর এ মিষ্টি না খেলে সে পড়বে না। কাজেই শিক্ষিকাকে খেতেই হতো। তা ছাড়া সব সময় তার লক্ষ থাকত শিক্ষিকার যেন কোনো অসুবিধা না হয়। (প্রাগুক্ত; পৃ. ৩২)

বঙ্গবন্ধুর দেশ ও দশের প্রতি ভালোবাসা, দায়িত্ববোধের অঙ্কুরোদগম রাসেলের অন্তরেও প্রস্ফুটিত ছিল। জননেত্রীর স্মৃতিচারণ- এর ওপর শুরু হলো এয়ার রেইড। আক্রমণের সময় সাইরেন বাজত। রাসেল ও ব্যাপারে খুবই সতর্ক ছিল।

যখনই সাইরেন বাজত বা আকাশে মেঘের মতো আওয়াজ হতো, রাসেল তুলা নিয়ে এসে জয়ের কানে গুজে দিত। আমরা বলতাম, তোমার কানেও দাও। নিজেও তখন দিত। সব সময় পকেটে তুলা রাখত। (প্রাগুক্ত; পৃ. ২৯)

Sheikh Rasel-শেখ রাসেল

পিতার মতোই অন্যের প্রতি ভালোবাসা, গভীর দায়িত্ববোধের ছাপ তার স্বভাবে সুস্পষ্ট ছিল।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাদের ছোট রাসেল সোনা শীর্ষক স্মৃতিগ্রন্থে প্রিয়তম ভাইকে কোথাও‘শিশু’ হিসেবে নয় বরং ‘ছোট্ট মানুষ’হিসাবে সম্বোধন করেছেন। তাঁর এই অভিবাদন যথার্থ এবং তাৎপর্যপূর্ণ।

দশ বছর বয়সী এই বিস্ময়কর বালকের, তারও চেয়ে সংক্ষিপ্ত জীবনের কর্ম ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করে শেখ রাসেলকে নির্দ্বিধায় শিশুর ঊর্ধ্বে অপার সম্ভাবনাময় একজন ‘মানুষ’ হিসেবে আজ আমি অভিহিত করবো। সে সম্ভাবনা বিশ্বাসঘাতকদের বুলেটের আঘাতে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেলেও সেই উজ্জ্বল আলোককণা নক্ষত্রের তীব্র বিচ্ছুরণ হয়ে আলো করে রেখেছে বাংলার স্বাধীনতার ইতিহাসকে। উচ্চকিত হয়ে আছে ছোট্ট মানুষটার মুখ নিঃসৃত একটি দেশ ও জাতির মুক্তির স্লোগান ‘জয় বাংলা’।

আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। বিস্ময়কর প্রতিভার ইঙ্গিত নিয়ে যে শিশুটির জন্ম হয়েছিল সেই অসাধারণ ছোট ‘মানুষটা’কে বাংলাদেশ হারিয়ে ফেলেছে। কিন্তু তার প্রতিভার আলোক দ্যুতি ভবিষ্যৎ শিশুদের পথ নির্মাণের কর্ণধার হতে পারে সহজেই।

জাতির পিতার সোনার বাংলার সামাজিক-সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক অঙ্গনে আজ তরুণ প্রজন্মের যথার্থ নেতৃত্বের বড্ড অভাব। আমি তরুণ প্রজন্মকে আহ্বান করবো, তারা যেন বাংলার উজ্জ্বল নক্ষত্র, বঙ্গবন্ধুর প্রিয়তম পুত্র, জননেত্রীর আদরের ছোট ভাই ‘ছোট মানুষ’শেখ রাসেলের জীবন থেকে পাঠ নিয়ে এই অভাব পূরণে এগিয়ে আসে। তার মতো বেদনাকে আত্মস্থ করার দীক্ষা নেয়। রাসেলের শিষ্টাচার, দেশপ্রেম, জীবেপ্রেম, সাংগঠনিক ক্ষমতাসহ নানা গুণাবলিকে চর্চা করে, জীবনে প্রয়োগ করে অপার সম্ভাবনাময় এক একজন ‘শেখ রাসেল’ হয়ে ওঠে।

শেখ রাসেল শিশু পার্ক (Sheikh Rasel Shishu Park) গোপালগঞ্জ

বাংলার আলোকিত ছোট্ট মানুষ শেখ রাসেলের ৫৮তম জন্মদিনের স্মরণ-উৎসব অসহনীয় বেদনার কিন্তু জননেত্রীর মতো আমরাও শোককে শক্তিতে পরিণত করব। বিস্ময়কর বালক রাসেলের হাতে গোনা দশ বছরের জীবনের চেয়েও সংক্ষিপ্ত জীবন পাঠ করে নানা অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ হবো। পথচলার বিচিত্র অধীতী ঠিক খুঁজে পাবো এ আমার বিশ্বাস। আগামী ১৮ অক্টোবর ২০২১ সাল বাংলাদেশের জাতির পিতার সর্বকনিষ্ঠ প্রিয়তম পুত্র, শেখ রাসেলের ৫৮তম জন্মদিনের শ্রদ্ধা-স্মরণ ‘দীপ্ত জয়োল্লাস অদম্য আত্মবিশ্বাস’এ প্রাণিত হয়েই বলছি, জীবন অফুরান, জীবনের মূলে আছে অকারণ আনন্দ। আসুন এই ক্রান্তিকালে আমরা সবাই যে যার মতো সুন্দর প্রতীতির উল্লাস খুঁজে নেই। একটু একটু করে বিশ্বাস জমিয়ে জমিয়ে আত্মবিশ্বাসের শক্ত ভিত নির্মাণ করি। পৃথিবীর জন্য, সবাই সবার জন্য ভালোবাসা লালন করি, পালন করি, ধারণ করি। অফুরন্ত আনন্দোল্লাস আর আত্মবিশ্বাস নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ‘সোনার বাংলা’ছোট্ট মানুষ শেখ রাসেলের ‘জয়বাংলা’র সকল অশুভ নাশ করি এবং শুভবোধের সৃজনে সমবেত হয়ে কাজ করে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাকে বাস্তবায়ন করি।

লেখক: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

One thought on “শেখ রাসেল: একটি উজ্জ্বল চিরঞ্জীব নক্ষত্র | Sheikh Rasel

Leave a Reply Cancel reply