আরবদের হটিয়ে যেভাবে ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল

ফিলিস্তিনের গাজা থেকে দুই মাইল উত্তরে কিবুটস এলাকা। এখানে ১৯৩০’র দশকে পোল্যান্ড থেকে আসা ইহুদীরা কৃষি খামার গড়ে তুলেছিল।

ইহুদিদের পাশেই ছিল ফিলিস্তিনী আরবদের বসবাস। সেখানে আরবদের কৃষি খামার ছিল। তারা কয়েক শতাব্দী ধরে সেখানে বসবাস করছিল।

সে সময় মুসলমান এবং ইহুদীদের মধ্যে সম্পর্ক মোটামুটি বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল।

কিন্তু ১৯৩০’র দশকে ফিলিস্তিনীরা বুঝতে পারলো যে তারা ধীরে-ধীরে জমি হারাচ্ছে। ইহুদিরা দলে-দলে সেখানে আসে এবং জমি ক্রয় করতে থাকে।

ইসরায়েলের সাবেক প্রেসিডেন্ট শিমন পেরেজ বছর দশেক আগে বিবিসি’র সাথে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ফিলিস্তিনদের কেন এই দশা হলো সেজন্য তাদের নিজেদেরই প্রশ্ন করা উচিত।

মি: পেরেজ বলেন, “অধিকাংশ জমি ফিলিস্তিনদের হাতেই থাকতো। তাদের একটি আলাদা রাষ্ট্র হতো। কিন্তু তারা সেটি প্রত্যাখ্যান করেছে। ১৯৪৭ সালে তারা ভুল করেছে। আমরা কোন ভুল করিনি। তাদের ভুলের জন্য আমরা কেন ক্ষমা চাইবো?”

১৮৯৭ সাল থেকেই ইহুদিরা চেয়েছিলেন নিজেদের জন্য আলাদা একটি রাষ্ট্র গড়ে তুলতে।

১৯১৭ সালে থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ফিলিস্তিনের ভূমি ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণে ছিল।

১৯১৭ সালের নভেম্বর মাসে তুরস্কের সেনাদের হাত থেকে জেরুজালেম দখল করে ব্রিটেন।

তখন ব্রিটিশ সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে ফিলিস্তিনের মাটিতে ইহুদিদের জন্য একটি আলাদা রাষ্ট্র গঠনের জন্য সহায়তা করবে।

ব্রিটেনের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড আর্থার জেমস বেলফোর বিষয়টি জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন ইহুদি আন্দোলনের নেতা ব্যারন রটসচাইল্ডকে।

তৎকালীন ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সে চিঠি ‘বেলফোর ডিক্লারেশন’ হিসেবে পরিচিত।

ইহুদীদের কাছে ব্রিটেন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে ফিলিস্তিনের জমিতে তাদের জন্য একটি রাষ্ট্র গঠনের সুযোগ করে দিবে।

যদিও রোমান সময় থেকে ইহুদিদের ছোট্ট একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী সে জায়গায় বসবাস করতো।

ইউরোপে ইহুদীদের প্রতি যে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সেটি তাদের একটি নিজস্ব রাষ্ট্র গঠনের ভাবনাকে আরো তরান্বিত করেছে।

১৯৩৩ সালের পর থেকে জার্মানির শাসক হিটলার ইহুদিদের প্রতি কঠোর হতে শুরু করেন।

ইতোমধ্যে জাহাজে করে হাজার হাজার ইহুদি অভিবাসী ফিলিস্তিনী ভূখণ্ডে আসতে থাকে।

তখন ফিলিস্তিনী আরবরা বুঝতে পারে যে তাদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে।

ফিলিস্তিনী আরবরা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য বিদ্রোহ করে। তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল ব্রিটিশ সৈন্য এবং ইহুদি নাগরিকরা।

কিন্তু আরবদের সে বিদ্রোহ কঠোর হাতে দমন করেছে ব্রিটিশ সৈন্যরা।

ফিলিস্তিনদের উপর ব্রিটিশ সৈন্যরা এতো কঠোর দমন-পীড়ন চালিয়েছিল যে আরব সমাজে ভাঙন তৈরি হয়েছিল।

ইহুদীরা তাদের জন্য একটি আলাদা রাষ্ট্র গঠনে বদ্ধপরিকর ছিল। ব্রিটেনের সহায়তায় সে অনুযায়ী তারা কাজ এগিয়ে নিচ্ছিল।

১৯৩০’র দশকের শেষের দিকে ব্রিটেন চেয়েছিল হিটলারের নাৎসি বাহিনীর বিরুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের অবস্থান জোরালো করতে।

সেজন্য আরব এবং ইহুদী- দু’পক্ষকেই হাতে রাখতে চেয়েছে ব্রিটেন।

১৯৬৭ সালে তেল আবিব শহরে যুদ্ধ প্রস্তুতি

১৯৩৯ সালের মাঝামাঝি ব্রিটেনের সরকার একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করে যেখানে বলা হয়েছিল পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য পঁচাত্তর হাজার ইহুদি অভিবাসী আসবে ফিলিস্তিনী ভূখণ্ডে। অর্থাৎ সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়েছিল।

ব্রিটেনের এ ধরনের পরিকল্পনাকে ভালোভাবে নেয়নি ইহুদিরা। তারা একই সাথে ব্রিটেন এবং হিটলারের বিরুদ্ধে লড়াই করার পরিকল্পনা করে।

তখন ৩২ হাজার ইহুদি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়। সেখান থেকে সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়ে ইহুদি সৈন্যরা ব্রিটেন এবং আরবদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলারের বাহিনীর দ্বারা লাখ-লাখ ইহুদি হত্যাকাণ্ডের পর নতুন আরেক বাস্তবতা তৈরি হয়।

১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পর যেসব ইহুদি বেঁচে ছিলেন তাদের জন্য জন্য কী করা যায় সেটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

তখন ফিলিস্তিনী ভূখণ্ডে ইহুদীদের জন্য একটি আলাদা রাষ্ট্র গঠনের চিন্তা আরো জোরালো হয়।

আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান ইসরায়েল রাষ্ট্রের পক্ষে জোরালো অবস্থান তুলে ধরেন।

মি: ট্রুম্যান চেয়েছিলেন হিটলারের হাত থেকে বেঁচে যাওয়া এক লক্ষ ইহুদিকে অতি দ্রুত ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে জায়গা দেয়া হোক।

কিন্তু ব্রিটেন বুঝতে পারছিল যে এতো বিপুল সংখ্যক ইহুদিদের ফিলিস্তিনী ভূখণ্ডে নিয়ে গেলে সেখানে গৃহযুদ্ধ হবে।

এ সময় ইহুদিদের সশস্ত্র দলগুলো ব্রিটিশ সৈন্যদের উপর ফিলিস্তিনের বিভিন্ন জায়গায় হামলা চালানো শুরু করে।

তখন ইউরোপ থেকে ফিলিস্তিনের উদ্দেশ্যে জাহাজে বোঝাই হয়ে আসা হাজার-হাজার ইহুদিদের বাধা দেয় ব্রিটিশ বাহিনী। কিন্তু তাতে খুব একটা লাভ হয়নি।

ইহুদি সশস্ত্র দলগুলো ব্রিটিশ বাহিনীর উপর তাদের আক্রমণের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।

তাদের উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি পরিস্থিতির তৈরি করা যাতে ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের জন্য ব্রিটেন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়। তখন সমাধানের জন্য ব্রিটেনের উপর চাপ বাড়তে থাকে।

এরপর বাধ্য হয়ে ব্রিটেন বিষয়টিকে জাতিসংঘে নিয়ে যায়।

১৯৪৭ সালের নভেম্বর মাসে ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে দু’টি রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় জাতিসংঘ। একটি ইহুদিদের জন্য এবং অন্যটি আরবদের জন্য।

ইহুদিরা মোট ভূখণ্ডের ১০ শতাংশের মালিক হলেও তাদের দেয়া হয় মোট জমির অর্ধেক। কিন্তু আরবদের জনসংখ্যা এবং জমির মালিকানা ছিল আরবদের দ্বিগুণ।

স্বভাবতই আরবরা এ সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি। তারা জাতিসংঘের এ সিদ্ধান্ত খারিজ করে দেয়।

কিন্তু ফিলিস্তিনীদের ভূখণ্ডে তখন ইহুদিরা বিজয় উল্লাস শুরু করে। অবশেষে ইহুদিরা একটি স্বাধীন ভূখণ্ড পেল। কিন্তু আরবরা অনুধাবন করেছিল যে কূটনীতি দিয়ে এ সমস্যার সমাধান হবে না।

জাতিসংঘের এ সিদ্ধান্তের পর আরব এবং ইহুদিদের মধ্যে দাঙ্গা শুরু হয়ে যায়। তখন ফিলিস্তিনী ভূখণ্ড ছেড়ে যাবার জন্য ব্রিটিশ সৈন্যরা দিন গণনা করছিল।

তখন ইহুদিদের সশস্ত্র দলগুলো প্রকাশ্যে আসা শুরু করে। তাদের গোপন অস্ত্র কারখানাও ছিল।

কিন্তু ইহুদিদের সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল তাদের বিচক্ষণ নেতৃত্ব।

এর বিপরীতে আরবদের কোন নেতৃত্ব ছিলনা। ইহুদীরা বুঝতে পেরেছিল যে নতুন রাষ্ট্র গঠনের পর আরবরা তাদের ছেড়ে কথা বলবে না। সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্য আগে থেকেই তৈরি ছিল ইহুদিরা।

সবার দৃষ্টি ছিল জেরুজালেম শহরের দিকে। মুসলমান, ইহুদি এবং খ্রিস্টানদের জন্য পবিত্র এ জায়গা।

জাতিসংঘ যে সিদ্ধান্ত দিয়েছিল সেখানে জেরুজালেম আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা ছিল।

কিন্তু আরব কিংবা ইহুদি- কোন পক্ষই সেটি মেনে নেয়নি। ফলে জেরুজালেম শহরের নিয়ন্ত্রণের জন্য দু’পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠেছিল।

জেরুজালেমে বসবাসরত ইহুদীদের অবরুদ্ধ করে রেখেছিল আরবরা। অন্য জায়গার সাথে জেরুজালেমের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে ইহুদীরা আরবদের উপর পাল্টা আক্রমণ শুরু করে।

অনেক বিশ্লেষক বলেন, তখন ইহুদীরা আরবদের নিশ্চিহ্ন করার পরিকল্পনা করেছিল।

যেহেতু আরবদের মধ্যে কোন সমন্বয় ছিল না সেজন্য ইহুদিরা একের পর এক কৌশলগত জায়গা দখল করে নেয়।

তখন ফিলিস্তিনের একজন নেতা আল-হুসেইনি সিরিয়া গিয়েছিলেন অস্ত্র সহায়তার জন্য।

কিন্তু সিরিয়া সরকার ফিলিস্তিনদের সে সহায়তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। সেখান থেকে ফিরে এসে আল হুসেইনি আবারো যুদ্ধে নামেন। এর কয়েকদিন পরেই তিনি নিহত হন।

পুরাতন মোটরসাইকেলের শোরুম এবং ঠিকানা ঢাকা ,বাইক বাজার (মোটর সাই‌কেল ক্রয়-বিক্রয়)

ইহুদিরা যখন তাদের আক্রমণের মাত্রা বাড়িয়ে দিলে ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাস নাগাদ বহু ফিলিস্তিনী আরব তাদের বাড়ি ঘর ছেড়ে পালিয়ে যায়।

ইহুদি সশস্ত্র গ্রুপগুলোর নৃশংসতা আরবদের মনে ভয় ধরিয়ে দেয়। অন্যদিকে ফিলিস্তিনী সশস্ত্র দলগুলো ইহুদিদের উপর কয়েকটি আক্রমণ চালায়।

কিন্তু ইহুদিদের ক্রমাগত এবং জোরালো হামলার মুখে ভেঙ্গে পড়তে শুরু করে ফিলিস্তিনীরা। তারা বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যায়।

অন্যদিকে জর্ডানের বাদশাহ আব্দুল্লাহ এবং অন্য আরব দেশগুলোর সরকার তাদের নিজ দেশের ভেতরে চাপে পড়ে যায়।

সেসব দেশের জনগণ চেয়েছিল, যাতে ফিলিস্তিনদের সহায়তায় তারা এগিয়ে যায়।

১৯৪৮ সালের ১৪ই মে ফিলিস্তিন ছেড়ে চলে যায় ব্রিটেন। একই দিন তৎকালীন ইহুদি নেতারা ঘোষণা করেন যে সেদিন রাতেই ইহুদি রাষ্ট্রের জন্ম হবে।

ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্মের এক ঘন্টার মধ্যেই আরবরা আক্রমণ শুরু করে। একসাথে পাঁচটি আরব দেশ ইসরায়েলকে আক্রমণ করে।

যেসব দেশ একযোগে ইসরায়েলকে আক্রমণ করেছিল তারা হচ্ছে – মিশর, ইরাক, লেবানন, জর্ডান এবং সিরিয়া। তাদের সৈন্য সংখ্যা ছিল প্রায় ত্রিশ হাজারের মতো।

অন্যদিকে ইসরায়েলের সৈন্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৫ হাজার।

কিন্তু আরব দেশগুলোর মধ্যে কোন সমন্বয় ছিলনা। তাছাড়া আরব নেতৃত্ব একে অপরকে বিশ্বাস করতো না।

জেরুজালেম দখলের জন্য আরব এবং ইসরায়েলের মধ্যে চলছে তীব্র লড়াই।

ইহুদিরা ভাবছিল জেরুজালেম ছাড়া ইহুদি রাষ্ট্রের কোন অর্থ নেই। অন্যদিকে মুসলমানদের জন্যও জেরুজালেম পবিত্র জায়গা।

তীব্র লড়াইয়ের এক পর্যায়ে ইসরায়েলি বাহিনী পিছু হটতে থাকে। তাদের অস্ত্রের মজুত শেষ হয়ে যায়।

সম্ভাব্য পরাজয় আঁচ করতে পেরে ইহুদিরা নিজেদের শক্তি সঞ্চয়ের জন্য সময় নেয়।

আর কিছুদূর অগ্রসর হলেই মিশরীয় বাহিনী তেল আবিবের দিকে অগ্রসর হতে পারতো। তখন জাতিসংঘের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।

যুদ্ধবিরতির সময় দু’পক্ষই শক্তি সঞ্চয় করে। কিন্তু ইসরায়েল বেশি সুবিধা পেয়েছিল। তখন চেকোস্লোভাকিয়ার কাছ থেকে আধুনিক অস্ত্রের চালান আসে ইসরায়েলের হাতে।

যুদ্ধ বিরতী শেষ হলে নতুন করে আরবদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ইসরায়েলি বাহিনী। একর পর এক গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে নেয় ইহুদিরা।

তেল আবিব এবং জেরুজালেমের উপর তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়।

জাতিসংঘের মাধ্যমে আরেকটি যুদ্ধ বিরতির মাধ্যমে সে সংঘাত থামে। ইসরায়েলী বাহিনী বুঝতে পরে তারা স্বাধীনতা লাভ করছে ঠিকই কিন্তু লড়াই এখনো থামেনি।

১৯৪৭ সালের নভেম্বর মাস থেকে ১৯৪৯ সালের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত ছয় হাজার ইহুদি নিহত হয়েছিল।

ইহুদিরা মনে করে তারা যদি সে যুদ্ধে পরাজিত হতো তাহলে আরবরা তাদের নিশ্চিহ্ন করে দিতো।

ইসরায়েলিরা মনে করেন ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ সেভাবে দু’টি দেশের স্বীকৃতি দিয়েছিল, সেটি যদি ফিলিস্তিনীরা মেনে নিতো তাহলে ফিলিস্তিন এবং ইসরায়েল নামের দুটি দেশ এখন পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ অবস্থান করতো।

আরব দেশগুলোর মধ্যে পারষ্পরিক আস্থা না থাকার কারণেই ১৯৪৮ সালের যুদ্ধে তারা পরাজিত হয়েছে এবং ইসরায়েল দেশটির জন্ম হয়ে সেটি স্থায়ী হতে পেরেছে। অনেক ঐতিহাসিক বিষয়টিকে এভাবেই দেখেন।

১৯৪৮ সালের পর থেকে সামরিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে অতি দ্রুত উন্নতি লাভ করে ইসরায়েল। তারা সুপার পাওয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়।

খ্রিস্টপূর্ব ৪৫০০-৩৫০০ এর মাঝামাঝি সময়ে জেরুজালেমে সর্বপ্রথম বসতি স্থাপিত হয়। আরবি শব্দ সালাম এবং হিব্রæ শালিমের সম্মিলিত রূপ হিসেবে ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এটির নামকরণ করা হয় ‘রুসালিমাম’। ১৫৫০-১৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে তৎকালীন মিশরের রাজা জেরুজালেমকে মিশর সা¤্রাজ্যের একীভূত করে সা¤্রাজ্যকে ভূ-মধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত করেন। ক্রমান্বয়ে মিশরীয় শাসকদের ক্ষমতা লোপ পেতে থাকলে সা¤্রাজ্যের বিভিন্ন অংশ থেকে স্বাধীনতার দাবী উত্থাপিত হয়। বাইবেলের বর্ণনামতে, জেরুজালেম তখন জেবুস এবং এর অধিবাসীগণ জেবুসিয়াস নামে পরিচিতি লাভ করে। বাইবেলের অপর এক বর্ণনায় পাওয়া যায়, খ্রিস্টপূর্ব ১১শ শতকে রাজা দাউদের (দাউদ আ.) জেরুজালেম জয়ের পূর্বে শহরটি জেুবুসিয়াসদের বাসস্থান ছিল। পরবর্তীকালে তার পুত্র সুলাইমান আ. শহরের দেয়াল সম্প্রসারিত করেন। ৭ম শতকে অর্থাৎ ৬৩৭ সালে খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব রা. এর শাসনামলে মুসলমানগণ জেরুজালেম জয় করে একে মুসলিম সা¤্রাজ্যের অঙ্গীভূত করে নেন। তিনি শহরের বাসিন্দাদের নিরাপত্তার প্রতিশ্রæতি প্রদান করে চুক্তিবদ্ধ হন।
আলেকজান্দ্রিয়ার পেট্রিয়ার্ক ইউটিকিয়াস বলেন, উমর চার্চ অব দ্য হলি সেপালচার পরিদর্শন করেন ও উঠোনে বসেন। নামাযের সময় হলে তিনি চার্চের বাইরে গিয়ে নামায আদায় করেন যাতে পরবর্তীতে কেউ তার নামাযের কারণকে ব্যবহার করে এই চার্চকে মসজিদে রূপান্তর না করে। ১০৯৯ সালে ১ম ক্রুসেডের সময় ইউরোপীয় খ্রিস্টান সেনাবাহিনী জেরুজালেম দখল করে এবং ১১৮৭ সালের ২ অক্টোবর সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ূবী কর্তৃক বিজিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তাদের আয়ত্ত¡াধীন ছিল। ১২১৯ সালে দামেস্কের সুলতান মুয়াজ্জিম নগরের দেয়াল ধ্বংস করেন। ১২৪৩ সালে মিশরের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী জেরুজালেম জার্মানির দ্বিতীয় ফ্রেডারিকের হস্তগত হয়। ১২৩৯ সালে তিনি দেয়াল পুনর্নির্মাণ করেন কিন্তু কেরাকের আমীর সেগুলোকে ধ্বংস করে দেন। ১২৪৩ সালে জেরুজালেম পুনরায় খ্রিস্টানদের দখলে আসে এবং দেয়ালসমূহ সংস্কার করা হয়। কিন্তু ১২৪৪ সালে তাতাররা শহরটি দখল করে এবং সুলতান মালিক নগরপ্রাচীর ভেঙ্গে ফেলেন। ১৫১৭ সালে উসমানী খলিফা ইয়াভুজ সুলতান সেলিম কুদসকে উসমানী খিলাফতের অন্তর্ভুক্ত করেন।
১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড বেলফোরের ঘোষণার মাধ্যমে ফিলিস্তিন উসমানী খিলাফতের হাতছাড়া হয়ে ব্রিটিশদের দখলে চলে যায় । সে বছর এমনই এক শীতার্ত ডিসেম্বরে ব্রিটিশ জেনারেল এডমন্ড অ্যালেনবি এসে পৌঁছান জেরুজালেমে। তবে ঘোড়ায় চড়ে বিজয়ী বীরের মতো জয়োল্লাস করতে করতে নয়, ঘোড়া থেকে নেমে পায়ে হেঁটে জেরুজালেমের জাফা গেট দিয়ে শহরে প্রবেশ করেন তিনি। এতদিন জেরুজালেম একটি পবিত্র ধর্মস্থান হলেও তা রাজধানীর স্বীকৃতি পায়নি। ব্রিটিশরা সেই স্বীকৃতি দেয়। আর তারই সঙ্গে শুরু হয়ে যায় নতুন সংঘর্ষের প্রেক্ষাপট। যে সংঘর্ষের এক দিকে রয়েছে এই শহরের ভূমিপূত্র ফিলিস্তিনিরা। অন্য দিকে ইহুদিরা।
ইউরোপ জুড়ে ইহুদি বিদ্বেষের সূচনা হলে দলে দলে ইহুদি শরণার্থীরা ভিড় জমায় ফিলিস্তিনে, বিশেষ করে জেরুজালেমে। ১৫১৭ থেকে মুসলিম অটোমান শাসকদের অধীনে থাকা ফিলিস্তিনিদের কাছে অস্তিত্বের সঙ্কট তৈরি হয়। ঠিক তার উল্টো প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয় ইহুদিদের মধ্যে। তাদের মধ্যে নিজেদের জন্য একটা আলাদা দেশ তৈরির আকাঙ্খা প্রবল হতে থাকে। কিন্তু এই আকাঙ্খার পিছনে তখন ধর্মের থেকেও জাতীয়তাবোধ ছিল প্রকট। রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপ থেকে আসা এই ইহুদিদের সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের সংঘাতের ক্ষেত্র ক্রমেই প্রলম্বিত হয়। তৈরি হয় ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব জাতীয়তাবাদ। যার নেতৃত্বে ছিল নামকরা ফিলিস্তিনি পরিবারগুলি। শুরু হয়ে যায় একের পর এক দাঙ্গা, রক্তপাত।
পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া যায় ১৯৩৯ সালে ইহুদিদের ফিলিস্তিনে আসার ওপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করে ব্রিটিশ প্রশাসন। এই নিষেধাজ্ঞার কারণেই, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে অনেক ইহুদি আশ্রয়ের জন্য ফিলিস্তিনে আসতে পারেনি। ১৯৪৭ সালে দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ বাঁধে। সমস্যা মেটাতে ফিলিস্তিনকে দুই ভাগে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে জাতিসংঘ। এক ভাগের অধিকার পাবে ইহুদিরা, অন্য ভাগে আরব ফিলিস্তিনীয়রা। আর জেরুজালেমের জন্য থাকবে বিশেষ মর্যাদা। সে কোনও ভাগের অংশ হবে না। আন্তর্জাতিক একটি কর্তৃপক্ষ এটি দেখভাল করবে। এ পরিকল্পনা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানাল আরবরা। নিজেদের অধিকৃত অঞ্চলকে পরের দিন স্বাধীন দেশ হিসেবে ঘোষণা করে ইহুদিরা। তৈরি হয় ইসরাইল। জেরুজালেমের পশ্চিম অংশের দখল থাকল তাদের হাতে। পূর্ব অংশ, যার মধ্যে শহরের পুরনো অংশ, ফিলিস্তিনিদের হয়ে দখলে রাখে জর্ডান। লাখ লাখ ফিলিস্তিনি ঘরছাড়া হয়। ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ সেনা প্রত্যাহার করা হলে সে বছরই ১৪ মে ডেভিড বেনগুরিনের নেতৃতে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ইসরাইল পশ্চিম জেরুজালেম দখল করে। এরপরে বেশ কিছু দিন জেরুজালেমের অধিকারের জন্য দু’পক্ষ থেকেই তেমন দাবি ওঠেনি। জর্ডানের শাসক, রাজা প্রথম আবদুল্লাহ জেরুজালেম থেকে নিজেদের রাজধানী আম্মানকে ঢেলে সাজতে অনেক বেশি ব্যস্ত ছিলেন। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক চাপে ইসরাইলের শাসকরাও সেভাবে জেরুজালেমকে নিয়ে আগ্রহ দেখায়নি। বরং তেলআবিব, হাইফা, আসকালোন-এর মতো শহর উন্নয়নেই ব্যস্ত ছিল। ইসরাইলের প্রথম দু’দশকের শাসকদের মধ্যে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী নেতাদের সংখ্যা ও প্রভাব ছিল বেশি। এই নেতারা বুঝেছিলেন, জেরুজালেমের অধিকার পেলেও বা সেখানে রাজধানী বানালেও, কর্তৃত্ব বজায় রাখা বেশ শক্ত। আন্তর্জাতিক মহলও জেরুজালেম ভুলে, তেলআবিবে দূতাবাস খুলতে শুরু করে। তবে আরব-ইসরাইল বিবাদ চলতেই থাকে।

ফাইভারে কাজ পাওয়ার উপায় – গিগ র‍্যাংকিং থেকে রিভিউ সংক্রান্ত টিপস
পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে ১৯৬৭ সালের জুনে। মিশরের তৎকালীন শাসক জামাল আব্দেল নাসের তাইরান প্রণালী দিয়ে ইসরাইলের জাহাজ যাতায়াত বন্ধ করে দেন। মিশর-ইসরাইল সীমান্তে সেনা সমাবেশ করেন। নাসেরের উদ্দেশ্য ছিল ভয় দেখানো। কিন্তু হঠাৎ পাল্টা বিমানহামলা চালিয়ে সব ওলট-পালোট করে দেয় ইসরাইল। সে হামলায় নাসেরের পুরো বিমানবাহিনী কার্যত ধ্বংস হয়ে যায়। পাশাপাশি গাজা ও সিনাই-এ স্থলযুদ্ধ শুরু করে ইসরাইল। এই অতর্কিত হামলায় দিশেহারা হয়ে পড়ে মিশর। নাসেরের চেষ্টায় সিরিয়া ও জর্ডানও যুদ্ধ নামে। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। ছয় দিনের যুদ্ধ শেষে ইসরাইল মিশরের কাছ থেকে গাজা ও সিনাই, পশ্চিম তীর আর সিরিয়ার কাছ থেকে গোলান মালভূমির দখল নেয়। সে সময়ই তারা চূড়ান্তভাবে পূর্ব জেরুজালেম দখল করে নেয়। ১৯৬৭ সালে ৬ দিনের আরব- যুদ্ধে ইসরাইল পাশাপাশি ১৯৮০ সালের জুলাই মাসে ইসরাইল পূর্ব এবং পশ্চিম উভয় জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করে। ২০১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। প্রতিবাদে বিশ্বের মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের সংগঠন ওআইসি তাৎক্ষণিক জরুরি বৈঠক আহবান করে ১৩ ডিসেম্বর পূর্ব জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানী ঘোষণা করে। ফলে জেরুজালেম এখন দুই রাষ্ট্র তথা মধ্যপ্রাচ্য সংকটের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এ সংকট ঘনীভূত হয়েছে আগ বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার মাধ্যমে। বিশ্বস¤্রদায়ের উচিত, এ মহাসংকটের আশু সমাধান করে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা।
লেখক: শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

%d bloggers like this: